দেশে বর্ষা এলেই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের বুকে এক অজানা আতঙ্ক ভর করে। প্রতি বছরই অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে- যা কোনো সাধারণ বা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং একে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় বললেই যথার্থ হয়। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, গাছপালা উজাড় করা এবং পাহাড়ের বুক চিরে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষকে। বিগত বছরগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারসহ পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে পাহাড়ধসে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। প্রতিবারই বড় কোনো দুর্ঘটনার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার সাময়িক হিড়িক পড়ে। কিন্তু বর্ষা শেষ হতেই সবকিছু আবার আগের রূপে ফিরে যায়। এই সাময়িক ও খণ্ডিত পদক্ষেপ দিয়ে যে পাহাড়ধসের মতো স্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
বলা বাহুল্য, পাহাড়ধসের প্রধান কারণগুলো এখন আর কারো অজানা নয়। একশ্রেণির প্রভাবশালী ভূমিদস্যু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় অবাধে পাহাড় কাটছে। পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো বনায়ন ধ্বংস করা। গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে- যখন পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলা হয়, তখন ভারী বৃষ্টিপাতে মাটি আলগা হয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। এর সাথে যোগ হয়েছে পাহাড়ের ঢালু অংশে অপরিকল্পিতভাবে কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি ও বস্তি তৈরি করা। দরিদ্র ও ভাসমান মানুষগুলো কম ভাড়ায় বা বাধ্য হয়ে জীবন হাতে নিয়ে এসব ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। আমরা মনে করি, পাহাড়ধস ঠেকাতে এখন আর শুধু ‘সতর্কবার্তা’ বা ‘উচ্ছেদ’ নাটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন জরুরি। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অমান্য করে যারা পাহাড় কাটছে- তাদের পরিচয় যাই হোক, দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্মম অত্যাচার বন্ধ না হলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিতেই থাকবে। পাহাড়ধসে আর একটি প্রাণও ঝরে যাক, তা আমাদের কাম্য নয়। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত অতিদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে বছরজুড়ে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। প্রশাসনকে কেবল বর্ষাকালের মৌসুমি তৎপরতা থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড় রক্ষায় একটি স্থায়ী, টেকসই এবং কঠোর নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবেই হয়তো ভবিষ্যতে এই নির্মম প্রাণহানির মিছিল থামানো সম্ভব হবে। আমাদের প্রত্যাশা, পাহাড়ধসে মৃত্যু রোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন সংশ্লিষ্টরা।
কেএমএএ/আপ্র/০৯.০৭.২০২৬