আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ। বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও মানবমুক্তির ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকার জন্মদিন। এই দিনেই জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক মহামানব, যিনি কেবল একটি জাতির কবি নন, বরং সাম্য, মানবতা, প্রেম, ন্যায় ও সম্প্রীতির চিরন্তন কণ্ঠস্বর। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি সেই মহান স্রষ্টাকে, যাঁর কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, আবার একই সঙ্গে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার অমৃতধারাও প্রবাহিত করেছে।
এবারের জন্মবার্ষিকীতে সরকার আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী। কারণ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশ নানা সামাজিক সংকট, অসহিষ্ণুতা, বিভাজন, বিদ্বেষ এবং মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের মুখোমুখি। চারদিকে প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটছে, অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটছে, কিন্তু মানুষে মানুষে দূরত্বও যেন কোথাও কোথাও বেড়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় নজরুল কেবল একজন কবি নন; তিনি হয়ে উঠেছেন সময়ের প্রয়োজন, সমাজের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন।
নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষ বৈষম্যের শিকার হবে না। তিনি ছিলেন মানবতার কবি। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। তিনি ছিলেন সম্প্রীতির কবি। তাঁর কণ্ঠে যেমন ধ্বনিত হয়েছে ইসলামের সুর, তেমনি অনুরণিত হয়েছে সনাতন ঐতিহ্যের মহিমা। তিনি বিভাজনের নয়, মিলনের কবি; সংঘাতের নয়, সহাবস্থানের কবি; ঘৃণার নয়, ভালোবাসার কবি।
আজ যখন সমাজের নানা স্তরে সহিংসতা, বিদ্বেষ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সামাজিক অস্থিরতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে, তখন নজরুলের সৃষ্টি নতুন করে পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা আরো বেড়ে যায়। তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধ শুধু সাহিত্যিক সম্পদ নয়; এগুলো একটি মানবিক সমাজ নির্মাণের নৈতিক ভিত্তি। তাঁর রচনার মধ্যে নিহিত রয়েছে সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ, আত্মমর্যাদা, সাহস এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার শিক্ষা।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’-এর প্রকৃত সার্থকতা হবে তখনই, যখন এটি কেবল রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত হবে। দেশের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে এবং প্রতিটি সামাজিক পরিসরে নজরুলচর্চার নতুন জোয়ার সৃষ্টি করতে হবে। শিশুদের হাতে তুলে দিতে হবে তাঁর কবিতা, তরুণদের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে হবে তাঁর দ্রোহ ও মানবতার বাণী, আর সমাজকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে তাঁর সাম্য ও সম্প্রীতির দর্শনের সঙ্গে।
বিশ্বজুড়ে যখন বিভাজন ও সংঘাতের অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে, তখন নজরুলের আলো হতে পারে মানবিক পুনর্জাগরণের এক শক্তিশালী দিশা। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত মানুষের মুক্তির আহ্বান আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর স্বপ্নের সাম্যের সমাজ, তাঁর আকাঙ্ক্ষিত মানবিক পৃথিবী এবং তাঁর লালিত সম্প্রীতির সংস্কৃতি আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে।
১১ জ্যৈষ্ঠে জাতীয় কবির জন্মদিনে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করি, ঘোষিত নজরুল বর্ষ হবে কেবল একটি উদযাপনের বছর নয়; এটি হয়ে উঠবে মানবিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের বছর, সম্প্রীতির সংস্কৃতি বিস্তারের বছর এবং সাম্যের বাংলাদেশ গড়ার বছর। বিদ্রোহের কবির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন তাঁর চেতনা বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে মানুষের জীবন ও সমাজে প্রতিফলিত হবে।
নজরুলের আলো ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে, হৃদয়ে হৃদয়ে। তাঁর মানবতার বাণীতে জাগ্রত হোক জাতির বিবেক। আর তাঁর সাম্য ও সম্প্রীতির দর্শনের পথ ধরে গড়ে উঠুক একটি আরো ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও মানবিক বাংলাদেশ।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আজকের প্রত্যাশা
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬