নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রগতি এবং বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আজ রোববার (১২ জুলাই) ঢাকায় আসছে। পাঁচ দিনের এই সফরে ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে সংস্থাটির প্রতিনিধিরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের সফর বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন সরকার আগের ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতার পরিবর্তে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় তিন বছরের একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে এবারের আলোচনায় শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, বরং সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রধান গুরুত্ব পাবে।
আইএমএফ প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করবে। এসব বৈঠকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এবারের সফরের মূল লক্ষ্য হবে বাংলাদেশ সরকার অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে কতটা প্রস্তুত এবং কতটা আন্তরিক, তা যাচাই করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগের কর্মসূচির আওতায় যেসব সংস্কারের কথা ছিল, তার অনেকগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি হয়েছে। নতুন কর্মসূচি নিতে হলে সরকারকে স্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা দেখাতে হবে।
তার মতে, আলোচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, বাজারভিত্তিক মুদ্রার বিনিময় হার কার্যকর করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
কেন নতুন ঋণ কর্মসূচি চাইছে বাংলাদেশ: ২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরে বিভিন্ন ব্যবস্থায় এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ছাড় হয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে জটিলতার কারণে আটকে রয়েছে।
আইএমএফের আগের কর্মসূচিতে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর করা।
কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় নতুন বাস্তবতায় নতুন কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে সরকার।
আলোচনায় নবম পে-স্কেল: আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় সরকারের ঘোষিত নবম জাতীয় বেতন স্কেলও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পর প্রতিবছর অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
আইএমএফ জানতে চাইতে পারে, এই অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, রাজস্ব বাড়ানো হবে নাকি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। একই সঙ্গে এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও বাজেট ঘাটতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সেটিও আলোচনায় আসতে পারে।
রাজস্ব সংস্কারে জোর দেবে আইএমএফ: বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো কম রাজস্ব আহরণ। বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় রাজস্ব আয় অনেক কম।
আইএমএফের নতুন কর্মসূচিতে করের আওতা বৃদ্ধি, কর অব্যাহতি কমানো, ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এনবিআরের ডিজিটাল সংস্কার এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সরকারি বেতন-ভাতা পরিচালনায় ঋণের ওপর নির্ভরতা আরো বাড়বে।
ব্যাংক খাত নিয়ে থাকবে কঠোর নজর: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতও আইএমএফের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মূলধন ঘাটতি পূরণের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
নতুন সরকার ব্যাংক খাতে সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। আইএমএফ দেখতে চাইবে এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে।
রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতিও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানি ও শিল্প উৎপাদন বাড়লে আবার চাপ তৈরি হতে পারে।
আইএমএফ এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো দেখতে চাইবে, যেখানে রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে রিজার্ভ শক্তিশালী হয়।
সফরের ফল নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পথ: অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের এই সফর শুধু নতুন ঋণ পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
প্রতিনিধিদলের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে পরবর্তী ধাপে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে। সেখানে ঋণের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং সংস্কারের শর্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
তবে সংস্কারের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে কিংবা ঋণের শর্ত আরো কঠোর হতে পারে। সব মিলিয়ে, ১২ থেকে ১৬ জুলাইয়ের আইএমএফ সফর বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামী দিনের পথরেখা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সানা/আপ্র/১২/৭/২০২৬