মো. মকসেদুর রহমান সাহাজাদা, দিনাজপুর: সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ৭ নম্বর আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের বড় বাউল ও গালতৈড় গ্রামের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে সর্বসাধারণের ব্যবহৃত একটি সরকারি পুকুর ও সংলগ্ন কবরস্থান রক্ষায় কবরস্থান কমিটি ও এলাকাবাসী আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে বড় বাউল ও গালতৈড় গ্রামে গিয়ে জানা যায়, বড় বাউল মৌজায় অবস্থিত ছোট জিনাহার নামের একটি পুকুর ও সংলগ্ন প্রায় ১৫ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের ব্যবহারে রয়েছে। পুকুরটির চারপাশে রয়েছে বিশাল কবরস্থান, যেখানে দুই গ্রামের হাজার হাজার মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুকুরের পানি গবাদিপশুর গোসল, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করে আসছেন স্থানীয়রা।
গ্রামবাসীর দাবি, সংশ্লিষ্ট জমির মূল মালিক ছিলেন তৎকালীন জমিদার শরবিন্দু নারায়ণ রায় ও পুনেন্দ নারায়ণ রায়। সিএস খতিয়ানে জমিটি ‘কোর্টস অব ওয়ার্ড’ হিসেবে সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য লিপিবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ ও অধিগ্রহণ আইনের আওতায় জমিটি সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসএ রেকর্ডের ৪৬৪, ২১১০, ৪৬৭ ও ৪৬৯ দাগভুক্ত ওই জমি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পত্তি ও কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে একটি মহল জাল কাগজপত্র তৈরি করে দখলের চেষ্টা করছে।
তাদের অভিযোগ, চিরিরবন্দর ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি খতিয়ানের কাগজপত্র গায়েব করে মৃত অখিল উদ্দিনের স্ত্রী তৈয়বা খাতুনের নামে একটি এসএ-২৭ নম্বর খতিয়ান তৈরি করা হয়। পরে ওই জমি বড় বাউল গ্রামের ফয়েজ উদ্দীনের ছেলে মো. ময়েন উদ্দীনের নামে কবলা দলিল করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
এলাকাবাসীর আরো অভিযোগ, ময়েন উদ্দীন এর আগেও চিরিরবন্দর উপজেলার ৯ নম্বর ভিয়াইল ইউনিয়নের রামপুর মৌজায় বড় জিনাহার নামের প্রায় ৩০ একর সরকারি সম্পত্তি দখল করেছেন। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় এলাকাবাসী ২০০৫ সালে ছোট জিনাহার পুকুর ও কবরস্থান রক্ষণাবেক্ষণ কমিটির মাধ্যমে আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে যুগ্ম জেলা জজ আদালত-১-এ দায়ের করা হলেও বর্তমানে সহকারী সিভিল জজ আদালত, চিরিরবন্দরে বিচারাধীন রয়েছে। মামলা নম্বর ২২৯/২১ এবং অন্য ৫৯৩/২৬।
মামলার পর আদালতের নির্দেশে উপজেলা ভূমি অফিস তদন্ত করে। স্থানীয়দের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে ওই জমিতে সরকারি স্বার্থ বিদ্যমান এবং এসএ-২৭ নম্বর খতিয়ানটি বানোয়াট ও ভুয়া বলে উল্লেখ করা হয়। ২০০৯ সালের ১১ জুন দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও সরকারি কৌঁসুলির যৌথ স্বাক্ষরে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়।
তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় এখন পর্যন্ত মামলায় কোনো সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই মামলার কার্যক্রম দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।
ছোট জিনাহার পুকুর ও কবরস্থান রক্ষা কমিটির পক্ষে মো. মকবুল হোসেন বলেন, “এই পুকুর ও কবরস্থান যুগ যুগ ধরে সর্বসাধারণের ব্যবহারে রয়েছে। একটি ভুয়া খতিয়ান বাতিল করে সরকারি সম্পত্তি ও কবরস্থান রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে বলেন, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা হলে একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী কবরস্থান সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানো থেকে রক্ষা পাবে।
সানা/আপ্র/১২/৭/২০২৬