গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

মেনু

রানা প্লাজা ধ্বংসস্তূপের নীরব প্রশ্ন-

বিচারহীনতা, অবহেলা ও নীতিহীনতার অবসান কবে

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:২৩ পিএম, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ০১:৩০ এএম ২০২৬
বিচারহীনতা, অবহেলা ও নীতিহীনতার অবসান কবে
ছবি

ফাইল ছবি

তেরো বছর পেরিয়েও রানা প্লাজা ধস কেবল একটি অতীতের দুর্ঘটনা নয়; এটি আজও আমাদের রাষ্ট্রীয় বিবেক, ন্যায়বিচার ব্যবস্থা এবং শ্রমিক নিরাপত্তা কাঠামোর এক নির্মম আয়না হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক হাজারেরও বেশি প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া সেই শিক্ষা যদি আজও কার্যকর নীতিতে রূপ না নেয়, তবে তা কেবল ব্যর্থতা নয়-এটি এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দায়।
    
২০১৩ সালের সেই বিভীষিকাময় সকালে যে ভবনটি মুহূর্তেই ধসে পড়ে, তার আগের দিনই দৃশ্যমান ফাটল ছিল। সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করে শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজে ফেরানো হয়েছিল-এ তথ্য আজ আর অজানা নয়। ফলে এই ঘটনা কোনোভাবেই নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি সুস্পষ্ট অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং মুনাফাকেন্দ্রিক নিষ্ঠুরতার ফল। অথচ তেরো বছরেও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি-এ বাস্তবতা আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও অকার্যকারিতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।

হত্যা মামলায় কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে কার্যত থমকে আছে। শত শত সাক্ষীর তালিকা থাকা সত্ত্বেও আদালতে তাদের অনুপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি এক ধরনের অবহেলা ও দায়সারা মনোভাবের পরিচায়ক। ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা যে অস্বীকৃতির সমান-এই মৌলিক সত্য যেন আমাদের নীতিনির্ধারণী পরিসরে গুরুত্ব পাচ্ছে না।

অন্যদিকে, বেঁচে থাকা শ্রমিকদের জীবন আজও যন্ত্রণাময় সংগ্রামের প্রতীক। পঙ্গুত্ব, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা এবং মানসিক আঘাত নিয়ে তারা টিকে আছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর ভর করে। অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না, পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত, পুনর্বাসনের সুযোগও সীমিত। আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুযায়ী এককালীন আয়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি-যা রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির ঘাটতিই নির্দেশ করে।

রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ এখন কেবল একটি পরিত্যক্ত জমি নয়; এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এক নীরব সাক্ষী। সেখানে গড়ে ওঠা অস্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন প্রতিবাদের প্রতীক হলেও, একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ বা পুনর্বাসন কেন্দ্রের অভাব আমাদের দায়বদ্ধতার ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। এই স্থানটিকে কেবল স্মরণ নয়, শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা জরুরি-যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানে, অবহেলার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ এবং জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট সব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আহত শ্রমিকদের জন্য আজীবন চিকিৎসা সহায়তা ও টেকসই পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন জরুরি। তৃতীয়ত, শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে।

রানা প্লাজা আমাদের শিখিয়েছে-অবহেলা যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন তার মূল্য হয় জীবন। সেই শিক্ষা যদি আমরা এখনো কাজে না লাগাই, তবে ভবিষ্যতের ট্র্যাজেডি ঠেকানোর কোনো নৈতিক অধিকার আমাদের থাকবে না। অতএব এখনই সময়-বেদনার ইতিহাসকে ন্যায়ের দৃষ্টান্তে রূপান্তর করার।
সানা/আপ্র/২৬/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে না পারলে থমকে যাবে জাতীয় উন্নয়ন
২৮ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে না পারলে থমকে যাবে জাতীয় উন্নয়ন

ঢাকা আজ শুধু একটি শহর নয়-এটি যেন পুরো দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক জীবনের একক কেন্দ্রবিন্...

হাম প্রাদুর্ভাবে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির নির্মম বাস্তবতা
২৭ এপ্রিল ২০২৬

হাম প্রাদুর্ভাবে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির নির্মম বাস্তবতা

অবহেলার অগ্নিপরীক্ষায় শিশুস্বাস্থ্য

দখলের বিষাক্ত ছায়ায় নদীর মৃত্যু, সময় এখন কঠোর পদক্ষেপের
২৫ এপ্রিল ২০২৬

দখলের বিষাক্ত ছায়ায় নদীর মৃত্যু, সময় এখন কঠোর পদক্ষেপের

নদী-এই শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে সভ্যতার প্রথম শ্বাস, কৃষির প্রথম ভোর, আর মানুষের বেঁচে থাকার অনিবার...

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও নীতির পরীক্ষা
২৩ এপ্রিল ২০২৬

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও নীতির পরীক্ষা

দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটের অভিঘাতে বিদ্যুৎ খাতে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তা এখন আর কেবল একটি খাতভি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই