নদী-এই শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে সভ্যতার প্রথম শ্বাস, কৃষির প্রথম ভোর, আর মানুষের বেঁচে থাকার অনিবার্য আশ্রয়। যে নদী একদিন গ্রামকে শহরে, শহরকে বাণিজ্যে, আর বাণিজ্যকে সভ্যতার গতিতে বেঁধেছিল-আজ সেই নদীই দখলের বিষাক্ত ছায়ায় নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়, এটি একটি জাতির জীবনরেখা; আর সেই জীবনরেখা যখন দখলদারির ইট-পাথরের ভারে চাপা পড়ে, তখন তা কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।
দেশের নদ-নদী ও জলাধারের অবৈধ দখলদারের সংখ্যা আজ প্রায় ২১ হাজার ৯৮২ জনে পৌঁছেছে-এই পরিসংখ্যান নিছক একটি হিসাব নয়, এটি এক ভয়াবহ বাস্তবতার দলিল। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী কিংবা কর্ণফুলী-প্রতিটি নদীই আজ কোনো না কোনোভাবে দখল, ভরাট ও দূষণের শিকার। যেখানে একসময় জলধারার অবিরাম স্রোত ছিল, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে গুদাম, দোকান, আবাসন ও শিল্প স্থাপনার কঠিন প্রাচীর। নদীর বুক যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে স্থাপনার অচল ভূমিতে।
এই দখলদারির পেছনে কেবল ব্যক্তিগত লোভ নয়, রয়েছে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া, রাজনৈতিক স্বার্থের নীরব সমর্থন এবং প্রশাসনিক শৈথিল্য। ফলে উচ্ছেদ অভিযান হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। একদিকে উচ্ছেদ, অন্যদিকে পুনঃদখল-এই চক্রের মধ্যে নদী মুক্তি পাচ্ছে না, বরং প্রতিদিনই আরো সংকুচিত হচ্ছে তার অস্তিত্ব।
সরকারি উদ্যোগ, আদালতের নির্দেশনা এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের দুর্বলতা এই সংকটকে আরো জটিল করে তুলেছে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগে ঘাটতি; নীতি আছে, কিন্তু ধারাবাহিকতা নেই। ফলে দখলদাররা বারবার ফিরে আসার সুযোগ পাচ্ছে, আর নদী হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক প্রবাহ।
অন্যদিকে দেশের নৌ অবকাঠামো উন্নয়ন, ফেরি সংযোজন, নৌপথ সম্প্রসারণ এবং পায়রা বন্দরের মতো বৃহৎ প্রকল্প ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে তখনই, যখন নদীগুলো থাকবে প্রবাহমান, নাব্য এবং দখলমুক্ত। নদী সংকুচিত হলে নৌপথের উন্নয়ন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
নদী দখলের ফলে সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে পরিবেশ ও জনজীবনে। জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নগরজীবনে দূষণ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। নদী হারানো মানে শুধু পানি হারানো নয়-এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জলবায়ু ভারসাম্য হারানোর সমান।
এই বাস্তবতায় এখন আর আংশিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে কঠোর ও স্থায়ী ব্যবস্থা। নদী দখলকে জিরো টলারেন্স নীতির আওতায় এনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উচ্ছেদকে একটি ধারাবাহিক ও নজরদারিভিত্তিক প্রক্রিয়ায় রূপ দিতে হবে, যাতে পুনঃদখল কোনোভাবেই সম্ভব না হয়। ডিজিটাল নদী মানচিত্র, সীমানা নির্ধারণ এবং স্থায়ী পিলার স্থাপন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
একই সঙ্গে ভূমি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভেতরে থাকা দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী চক্রকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে নদী রক্ষায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, যাতে এটি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব না থেকে একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
নদী কোনো সাধারণ সম্পদ নয়-এটি একটি জাতির শ্বাসপ্রশ্বাস, তার ইতিহাস, তার ভবিষ্যৎ। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচে, নদী মরলে সভ্যতা থেমে যায়। তাই দখলের বিষাক্ত ছায়া সরিয়ে নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ফিরিয়ে আনা এখন আর বিকল্প নয়-এটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।
সানা/আপ্র/২৫/৪/২০২৬