গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে না পারলে থমকে যাবে জাতীয় উন্নয়ন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:০৭ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৮:১৮ এএম ২০২৬
রাজধানীর ওপর চাপ কমাতে না পারলে থমকে যাবে জাতীয় উন্নয়ন
ছবি

দেশের প্রধান কল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বড় বড় হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রায় সবই ঢাকাকেন্দ্রিক -ছবি সংগৃহীত

ঢাকা আজ শুধু একটি শহর নয়-এটি যেন পুরো দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক জীবনের একক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই কেন্দ্রীভবনের ফলাফল এখন আর উন্নয়ন নয়, বরং এক গভীর কাঠামোগত সংকট। রাজধানীর ওপর ক্রমবর্ধমান জনচাপ, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং কর্মসংস্থানের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন এখন জাতীয় উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস্তবতা হলো-এই চাপ যদি কমানো না যায়, তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াই একসময় থমকে যাবে।

গ্রাম থেকে শহরে মানুষের এই অবিরাম স্রোত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ভারসাম্যহীনতার ফল। কৃষি খাতে আয়ের সীমাবদ্ধতা, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের অভাব, মৌসুমি দুর্যোগ, নদীভাঙন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মানুষ বাধ্য হচ্ছে রাজধানীমুখী হতে। কিন্তু ঢাকায় এসে তারা যে জীবন খুঁজে পায়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা, ভাড়া বাসার সংকট এবং নিম্ন আয়ের অস্থির কর্মজীবন।

প্রতিদিন নতুন মানুষ ঢাকায় আসছে, পরিবারসহ স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ রিকশা চালাচ্ছে, কেউ দিনমজুরি করছে, কেউ ছোট ব্যবসায় টিকে থাকার লড়াই করছে। কিন্তু এই শহরের অবকাঠামো, আবাসন ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবা এই বিপুল চাপ বহন করার মতো প্রস্তুত নয়। ফলে তৈরি হচ্ছে যানজট, বাসস্থানের সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং সামাজিক চাপের এক জটিল চক্র।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কর্মসংস্থানের চরম কেন্দ্রীভবন। দেশের প্রধান কল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বড় বড় হাসপাতাল, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রায় সবই ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের সন্ধানে সারা দেশ থেকে মানুষ এখানে আসতে বাধ্য হচ্ছে। এই প্রবণতা কেবল রাজধানীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো দেশের আঞ্চলিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সুপরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ। শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। বিভাগীয় শহরগুলোকে ঢাকার সমমানের নাগরিক সুবিধা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে উন্নত হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে জেলা শহরগুলোতেও ধাপে ধাপে এই সুবিধা বিস্তৃত করা জরুরি। সেখান থেকেই আধুনিক মানসম্মত নগরায়ণ পেীঁছে যাবে উপজেলাগুলোতে। এভাবেই একদিন পুরো দেশটাই হয়ে উঠবে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের দৃষ্টান্ত।

শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে স্থাপন করা গেলে আঞ্চলিক অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। এতে শুধু কর্মসংস্থানই বাড়বে না, বরং ঢাকামুখী জনস্রোতও স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রমাণ করেছে যে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া টেকসই নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেউ রাজধানীর ওপর চাপ কমিয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতা ছড়িয়ে দিয়ে, কেউ আবার নতুন নগর কেন্দ্র তৈরি করে জনসংখ্যার ভারসাম্য এনেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প নেই।

আজকের বাস্তবতা অত্যন্ত স্পষ্ট-ঢাকা যত বড় হচ্ছে, সমস্যাও তত জটিল হচ্ছে। যানজটে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, পরিবেশের মান দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, আর জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই অবস্থাকে চলতে দেওয়া মানে ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে নিজের হাতে বাধাগ্রস্ত করা।

অতএব এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার। পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ, আঞ্চলিক উন্নয়ন, এবং সমান সুযোগের অর্থনীতি গড়ে তুলতে না পারলে রাজধানীর ওপর চাপ আরো বাড়বে। আর সেই চাপ একসময় পুরো রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাঠামোকেই অচল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর-উন্নয়ন কি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে সারা দেশে বিস্তৃত হবে। যদি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া না হয়, তবে জাতীয় উন্নয়নের গতি কেবল ধীর নয়, একসময় থেমেও যেতে পারে।
সানা/আপ্র/২৮/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার

প্রতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। বর্তমান সময়ে আত্মহত্যার মতো একটি স...

শত পুলিশেও নিরাপত্তা নেই—এ কোন চাঁদাবাজির দুঃসাহস
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শত পুলিশেও নিরাপত্তা নেই—এ কোন চাঁদাবাজির দুঃসাহস

চট্টগ্রামে এক চিকিৎসকের কাছে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীর পরিচয়ে প্রথমে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, নির্ধারিত...

সংঘাতের রাজনীতি নয়, সমঝোতার পথেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংঘাতের রাজনীতি নয়, সমঝোতার পথেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ

বাংলাদেশের রাজনীতি আবারো এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার চেয়ে পরস্পরকে ব...

আইনের ফাঁক বন্ধ না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামবে না
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আইনের ফাঁক বন্ধ না হলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামবে না

একজন অপরাধীকে গ্রেফতার করা পুলিশের সাফল্য হতে পারে; কিন্তু একই অপরাধী যদি কিছুদিন পর আবারো একই অপরাধ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে ড. ইউনূসকে

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এই কর পরিশোধের জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণকে ৩ অর্থবছর সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন এই রায় সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 23 ঘন্টা আগে