জগদীশ সানা
২০০৪ সালে জুকারবার্গ সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয় অ্যাপসটি আবিষ্কার করার পর তার নাম দেন ফেসবুক। নাম শোনামাত্র যে কেউ সহজে অনুমান করতে পারেন আসলে মানুষের মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি সংরক্ষণ এবং বিনিময়ের মাধ্যম এটি। কিন্তু ফেসবুক তার এতটুকু কাজ করে যেন খুশি হলো না। সীমাবদ্ধও থাকলো না। খুব দ্রুতই অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যুক্ত করে ফেললো। বলা যেতে পারে যুক্ত হয়ে গেল। বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর বহুমাত্রিক ইচ্ছে ও ইন্টারেস্ট এর পিছনে প্রতিদিন কাজ করে চলেছে।
বর্তমানে ফেসবুকে নেই এমন কিছু প্রায় নেই। মানুষের প্রতিকৃতি, ভিডিওচিত্র, চলচ্চিত্র, অডিও সাউন্ড, বিভিন্ন রকম বিনোদন, যেমন- গান, নাটক, আবৃত্তি, নৃত্য, কৌতুক, লেখালেখির বিভিন্ন দিক; যেমন- সাধারণ যোগাযোগ, সংলাপ, মতামত, মন্তব্য, পাল্টা মন্তব্য ছাড়াও অনেকেই আজকাল কাব্য- সাহিত্য চর্চার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছেন ফেসবুককে। তারা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী, স্মৃতিকথা, রম্য রচনা লিখছেন। অনেকে বিখ্যাত মনীষীদের বিখ্যাত বাণীগুলো সুন্দর সুন্দর রঙিন ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে শেয়ার করছেন। নিজের চিন্তাভাবনাগুলো অনেকে আবার একইরকম আকার দিয়ে ফেসবুকে ছাড়ছেন। অনেকে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন নিজের কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত কোনো কাজের। রাজনীতি, সরকার, মন্ত্রী-এমপিদের দায়িত্ব ও কার্যাবলী, দেশের অর্থনীতি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, উন্নয়ন সকল বিষয়ে লিখছেন ফেসবুকাররা যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে। যেটা ভালো লাগছে লাইক দিচ্ছেন, কমেন্ট করছেন, আবার অনেকে শেয়ার করে বন্ধুদের মধ্যে তথ্যটি মুহূর্তে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে অনেক বিষয় মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে ফেসবুকে।
লিংক হচ্ছে অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য ও ডকুমেন্টস; যেমন ইউটিউব তার অন্যতম। টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত অনেক খবর ও অনুষ্ঠান ফেসবুকের টাইমলাইনে চলে আসছে দেদারছে। অনেকে খবর দেখতে মিস করলেও পরে সময় করে দেখে নিতে পারছেন। সব মিলিয়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ (ঋৎবব ঋষড়ি ড়ভ ওহভড়ৎসধঃরড়হ) প্রায় শতভাগ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে ফেসবুক। এটি দীর্ঘদিনের জনআকাক্সক্ষার একটি ইতিবাচক বাস্তবায়ন ও প্রতিফলন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্রমবর্ধমান শিক্ষা-হারের এই পৃথিবীতে ফেসবুক চালানোর মত ন্যূনতম শিক্ষা এখন বহু মানুষের রয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে তাই ফেসবুকের ব্যবহার বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তবে এর নেতিবাচক দিকও কম নয়।
বাংলাদেশ বা ভারতে ফেসবুক জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে মোটামুটি ২০১২ সালের পর থেকে। প্রথমে অবাধ তথ্য-প্রবাহের সুযোগের অপব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন গালিগালাজ লিখে। ফেসবুকের কারো লেখা যদি কারো ভালো না লাগে তাহলে তার উপর নিজের মতামত যেকেউ দিতেই পারেন। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই শালীন হতে হবে। মনে যা এলো লিখলাম, সেগুলো সবাই দেখলো। আবার তারাও পাল্টা কিছু অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করলো। এমন চলতে থাকলে এইসব মিডিয়ার নৈতিকশক্তি বলে আর কিছু থাকবে না। হারাতে পারে গ্রহণযোগ্যতাও। এত জনপ্রিয়তার মধ্যেও কিন্তু এখনো সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণি ফেসবুককে কোনো দায়িত্বশীল মিডিয়া মনে করেন না। এটি একটি বাস্তবতা। তাদের অনেকেই ফেসবুকের একাউন্ট পর্যন্তও এখনো খোলেননি।
আমাদের মনে রাখা উচিত প্রযুক্তি যত উন্নত হোক না কেন, তাকে অবশ্যই একটি নীতিমালার মধ্যে কাজ করতে হয় । যেকোনো মিডিয়ারই একটি সেলফ-সেন্সরশিপ অন্তত থাকা উচিত। তানা হলে তা মিডিয়া হয় না। এ কারণেই স্বাভাবিকভাবেই নীতিমালা তৈরি হলো বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে। একটি আইসিটি আইন প্রণীত ও পাশ হয়েছে বাংলাদেশে।
স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা বা অরাজকতা নয়- এটা আমরা সবাই জানি। এখন এই আইসিটি আইনের অধীনে ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলো পরিচালিত হচ্ছে। উল্টাপাল্টা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে অনেককে। বিচারও হয়েছে। হয়েছে শাস্তিও। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত। তিারপরও ফেসবুকে এখনো পুরোপুরি শালীনতা বা ভদ্রতা ফিরে আসেনি। এখনো লক্ষ্য করা যায়, অনেক অশালীন ভাষা (লিখতে পারছি না বলে দুঃখিত)। অনেকে আবার কৌশলে ভাষাগুলো রিভার্স করে নিয়ে এমন কিছু লিখছেন যেগুলোও ভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে না।
অনেকের অনেক রকম ব্যক্তিগত বিষয়, লেনদেন বা অন্য কিছু সমস্যা থাকতে পারে কারো সাথে। তারা সেসব বিষয়গুলোকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কমেন্ট বক্সে আনছেন। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয় মেসেঞ্জারে শেয়ার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কমেন্ট বক্সে লিখছেন। একবার ভাবছেন না বহু বন্ধুসহ সকলের জন্য উন্মুক্ত এ জায়গা। এটি একটি মিডিয়া। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে অপ্রাসঙ্গিক ‘আক্রমণ’ করা কোনো ভদ্রতার পর্যায়ে পড়ে না। প্রতিটি বিষয়ে প্রতিটি মানুষের নিজস্ব যুক্তি থাকে। কিন্তু এসব যুক্তি খন্ডন করার জায়গা হিসেবে এই প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক ব্যবহার করা একেবারেই উচিত নয়।
বেশ কয়েক বছর ধরে ফেসবুকের কন্টেন্টের মধ্যে বেশি জায়গাটা দখল করে আছে ভিডিও। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ভিডিওগুলোর বেশির ভাগই ফেক। অথেনটিক কোনো তথ্য উৎস এই ভিডিওগুলোর নেই। মনগড়া। তা ছাড়া সম্প্রতি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই দিয়ে অবিকল বাস্তবতার মতো ভিডিও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আসলে সেগুলো বাস্তব নয়। সুতরাং এসব ভিডিওর তথ্য এবং ছবি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজে লাগে না। এগুলো সারাক্ষণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। তাই ভেবে দেখার সময় হয়েছে আসলেই এ ভিডিওগুলো আমরা দেখবো, না দেখবো না।
বেশির ভাগ ভিডিও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং দর্শকদের ধোঁকা দিয়ে চলেছে। তাই এই ভিডিওগুলোর উপরে আমাদের কোনোভাবেই কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। উপরন্ত ভিডিওগুলো যাতে স্ক্রিনে না আসে তার ব্যবস্থা করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অনেকে বিষয়বস্তু ভালো করে মূল্যায়ন না করে ‘লাইক’ করেন। পেছনে তার একটি উদ্দেশ্য কাজ করে। বিষয় পছন্দ হয়নি কিন্তু লোকটির সাথে তার আর্থিক লেনদেন আছে। তাই তার বিষয়টিতে ‘লাইক’ দেন যা আবার অনেকের কাছে হাস্যকর। আবার ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক ভালো বিষয়কে এড়িয়ে যান বা বাজে মন্তব্য লিখে দেন। আমি একটি অর্থনৈতিক বা অন্য সুবিধা চেয়েছিলাম। পাইনি। সুতরাং তার একটা ভালো জিনিসের ওপর খারাপ মন্তব্য করে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে বন্ধু বা ফলোয়ারদের। ফেসবুকের যেসব বন্ধুরা এসব লিখছেন তারা যে তাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান ক্রমাগত নিচে নিয়ে যাচ্ছেন এটিও তারা অনুধাবন করতে পারছেন না। কারণ যিনি যে বিষয়গুলো লেখেন, ওই লেখাগুলোর মধ্য দিয়ে ওই মানুষটি কেমন তা আস্তে আস্তে সকলের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে হয়তো তাদের বন্ধুরাই তাদের বন্ধুর তালিকা থেকে বাদ দিতে বাধ্য হন। ফেসবুকে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি লেখালেখি অযথা খারাপ সম্পর্ক তৈরি করে। তাই প্রতিটি বন্ধুকে এ বিষয়ে সচেতন থেকে কোনো ধরনের দরকষাকষি পর্যায়ে না গিয়ে বিতর্কের প্রথমেই থেমে যাওয়া ভালো।
আমাদের সকল ফেসবুকারদের উচিত হবে কোনো ধরনের বিতর্কে না জড়ানো। তা-না হলে এই প্ল্যাটফর্মের আকর্ষণ থাকবে না। একটা বাড়িতে যদি প্রতিদিন ঝগড়া হয়; কী নিয়ে, কেন, কার সাথে, কখন ঝগড়া হলো, দোষ কার -এটা মানুষ দেখে না। মানুষ বলে- বাড়িটা খারাপ। কিছু বন্ধুর কারণে ফেসবুকের কপালে যেন ‘খারাপ বাড়ি’ র খেতাব না জোটে।
লেখক: কবি ও কথাশিল্পী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
সানা/আপ্র/৩০/৪/২০২৬
সোশ্যাল মিডিয়ার লেখালেখি
প্রত্যাশা ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:৩২ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
| আপডেট: ০৯:২১ এএম ২০২৬
প্রতিনিধিত্বশীল ছবি