ড. এ কে এম মাহমুদুল হক: জ্বালানি সংকটের মধ্যে গ্রীষ্মের শুরুতেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে দেশ। তীব্র গরমের এই সময়ে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষকে ভুগতে হচ্ছে বেশি। শহরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও গ্রামে কোথাও কোথাও ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না, এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে; ক্ষতির মুখে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। বিদ্যুৎ স্বল্পতার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকট শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন সক্ষমতাকেও ব্যাহত করছে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নাজুক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা সংবেদনশীল।
যদিও ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাব কিছুটা রয়েছে, তবু জ্বালানি পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের চিত্র পরিস্থিতির গভীরতাকেই নির্দেশ করে। অসহনীয় গরমে অনেক স্থানে দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় লোডশেডিং চলায় মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, যা সহসা কাটবে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) অনুযায়ী, দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০০০-২৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকা এবং বাঁশখালীর এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি ইউনিট উৎপাদনের বাইরে থাকা।
ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা লোডশেডিং বৃদ্ধি করেছে। ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে মফস্বল ও গ্রামীণ জনপদ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোথাও কোথাও চাহিদার তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্রও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি, বিশেষত বোরো ধান উৎপাদন, ব্যাপকভাবে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ লাখ বিদ্যুৎ-সংযুক্ত সেচ পাম্প রয়েছে। বোরো মৌসুমে শুধুমাত্র সেচের কারণেই বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৫০০০ মেগাওয়াট, যা মোট চাহিদার একটি বড় অংশ। কিন্তু ২০২৪-২০২৬ সময়ে জ্বালানি সংকট, গ্যাস-ঘাটতি এবং উৎপাদন সক্ষমতার অসম ব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার ফলেই ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং কৃষি খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বোরো মৌসুমে অনেক গ্রামীণ এলাকায় দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলোয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলে কৃষকদের গড় বিদ্যুৎপ্রাপ্তি দিনে পাঁচ ঘণ্টারও কম ফলে সেচচক্র ভেঙে পড়ছে এবং জমিতে ফাটল দেখা দিচ্ছে।
বিদ্যুৎচালিত পাম্পের মালিকরা দিনভর বিদ্যুতের অপেক্ষায় বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন; আর বিদ্যুৎ এলেও রাতে বা ভোরে সেচ দিতে গিয়ে কৃষকদের অতিরিক্ত শ্রম ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। ২০০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতির এই পরিস্থিতিতে সেচনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা মারাত্মক চাপে পড়েছে, আর কৃষক হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
সরকারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরাঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকা থেকে ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরিয়ে গ্রামীণ সেচে সরবরাহ করতে হয়েছে যা সংকটের গভীরতারই প্রমাণ। এ ধরনের সিদ্ধান্ত জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে; ফলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে বিদ্যুতের ব্যবহার আরো বাড়িয়ে দিতে পারে, যেমনটি জ্বালানি পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে।
এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। ফসল উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়া তার মধ্যে অন্যতম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (উঅঊ)-এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২০২৪ সালের বোরো মৌসুমে ২.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে, যার সিংহভাগই নিরবচ্ছিন্ন সেচের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো ধানে নির্ধারিত সময়ে সেচ না হলে ফলন ১৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একাধিক সেচচক্র ব্যাহত হলে জমিতে স্থায়ী ফলনহানির ঝুঁকি তৈরি হয়, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য শেষ মুহূর্তে চরম অসহায় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ফলে এই বিদ্যুৎনির্ভর সেচসংকট শুধু কৃষকের জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না; এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, চালের বাজারের স্থিতিশীলতা এবং গ্রামীণ দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণ সবকিছুর ওপর তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
সংকটের প্রভাব আগামী বছরের চাষাবাদেও ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় কোল্ড স্টোরেজগুলোয় সংরক্ষিত ভোগ্য আলু ও বীজ আলু বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বড় ঝুঁকির মুখে। সাম্প্রতিক ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে হিমাগারগুলো নিরবচ্ছিন্ন তাপমাত্রা বজায় রাখতে দীর্ঘ সময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
খাত-সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, অনেক কোল্ড স্টোরেজে জেনারেটর চালাতে গিয়ে মাসিক অতিরিক্ত খরচ ১০-১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজেলের সংকট ও অনিশ্চিত সরবরাহ। ফলে হিমাগার পরিচালনা ক্রমেই আর্থিকভাবে অটেকসই হয়ে উঠছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে কোল্ড স্টোরেজে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হলে সংরক্ষিত আলুর গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে একদিকে ভোগ্য আলু পচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বীজ আলুর অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদন প্রক্রিয়াও হুমকির মুখে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কোল্ড স্টোরেজ খাতে ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে কৃষকের আয়, বাজারে আলুর সরবরাহ এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।
চলমান তাপদাহ ও বিদ্যুৎ সংকটের যৌথ প্রভাবে দেশের পোল্ট্রি, মৎস্য এবং শিল্প-বাণিজ্য খাত মারাত্মক চাপে রয়েছে। গরমের মৌসুমে পোল্ট্রি খামারে সার্বক্ষণিক ফ্যান ও বায়ু চলাচল অপরিহার্য হলেও গ্রামীণ এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে শেডের তাপমাত্রা দ্রুত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে।
ফলে অনেক খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে, আর ক্ষুদ্র খামারিরা জেনারেটর বা আইপিএসের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে না পেরে গুরুতর লোকসানে পড়ছেন। একইভাবে, মৎস্য খাতে বিদ্যুৎনির্ভর পানি সরবরাহ ও অক্সিজেন ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হওয়ায় পুকুরে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না; এতে মাছের বৃদ্ধি কমছে এবং গরমে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ অঞ্চলের চাষিরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এর পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা খাতে বিদ্যুৎ ঘাটতি এবং ডিজেল সংকট মিলিতভাবে দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে। সাভার-আশুলিয়া এলাকায় পোশাক ও চামড়া শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৪০ শতাংশে নেমে আসায় সময়মতো রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, মফস্বল শহরগুলোয় সন্ধ্যার আগেই দোকান বন্ধ রাখা বা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আশঙ্কায় ক্ষুদ্র ব্যবসায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই বিদ্যুৎ সংকট গ্রামীণ উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে একযোগে দুর্বল করে দিচ্ছে।
চলমান জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা ও টেকসই বাস্তবায়ন গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এসব কর্মসূচি মূলত কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ, কোল্ড স্টোরেজ, পোল্ট্রি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষকের আয় সংকুচিত হবে এবং লক্ষ্যভুক্ত পরিবারের জন্য প্রকৃত সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠবে।
ফলে নীতিগতভাবে যত উচ্চাভিলাষই থাকুক, বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হলে এসব কর্মসূচি জ্বালানি সংকটের চাপে কার্যত প্রতীকী সুবিধায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ছাড়া কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে পারবে না।
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা এই প্রথম নয়; তবে এবার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে ভৌগোলিকভাবে সীমিত কয়েকটি অঞ্চলের তেল ও গ্যাস মজুদের ওপর নির্ভর করে কোনো সভ্যতাই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এই অটেকসই জীবনধারা, যা মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের স্বাভাবিক বিবর্তনের মতো গ্রহণ করেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা এখন আর নৈতিক বা আদর্শগত পছন্দের বিষয় নয় এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য, যারা এখনো পূর্ণমাত্রার শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফাঁদে পুরোপুরি আবদ্ধ হয়নি, এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এখনই সময় ভিন্ন পথে হাঁটার আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে সরে এসে সৌর, বায়ু, জৈবশক্তি এবং জ্বালানি দক্ষতার মতো স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত উৎসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। খণ্ডখণ্ড প্রকল্প নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে জ্বালানি রূপান্তর ও দক্ষতাকে স্থান দেওয়া জরুরি।
দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় এই মুহূর্তে জ্বালানি খাতে বেশি সময়, সম্পদ ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যৎ সংকটে আবারো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই দেরি নয়, সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সানা/আপ্র/২৯/৪/২০২৬