গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

কলম যখন কারাবন্দি, সাংবাদিকদের বন্দিত্বে প্রশ্নবিদ্ধ ন্যায়বিচার

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:২৪ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১৩:৩৫ এএম ২০২৬
কলম যখন কারাবন্দি,  সাংবাদিকদের বন্দিত্বে প্রশ্নবিদ্ধ ন্যায়বিচার
ছবি

কারাবন্দি চার সাংবাদিকের মুক্তি দাবি করেছে সিপিজে- ফাইল ছবি

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতা, তার গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা এবং আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভিন্নমত ও সমালোচনার প্রতি তার আচরণে। সেখানে যদি কলমকেই শৃঙ্খলিত করা হয়, যদি সংবাদপেশার মানুষদের দীর্ঘকাল বিচারহীন বন্দিত্বে রাখা হয়, তবে তা শুধু বিচ্ছিন্ন অন্যায় নয়-বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত এক বিপজ্জনক প্রবণতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বাস্তবতায় চারজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের দীর্ঘ কারাবাস সেই অস্বস্তিকর সত্যটিকেই নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

ফারজানা রুপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল হক বাবু ও শ্যামল দত্ত-এই চারজন সিনিয়র সাংবাদিক খুনের মামলায় গ্রেফতার হয়ে দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হয়নি, অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়নি। আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হলো-অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই নির্দোষ। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই নীতিকেই অগ্রাহ্য করে তাঁদের অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা হয়েছে। এটি শুধু বিচারবিলম্ব নয়; এটি বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আরো গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বন্দিত্বের পেছনে যে প্রেক্ষাপট উঠে আসছে তা নিছক আইনি প্রক্রিয়ার সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ও পেশাগত প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত বহন করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অবস্থানের কারণেই তাঁদের এসব মামলায় জড়ানো হতে পারে। যদি এমনটি সত্য হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তি নয়, গোটা গণমাধ্যমের জন্য এক অশনিসংকেত। কারণ, স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র কার্যত অচল; আর সেই গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের মুখে ঠেলে দেওয়া মানে রাষ্ট্র নিজেই তার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া।

মানবিক দিক থেকেও পরিস্থিতি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। একজন নারী সাংবাদিককে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সেলে রাখা হয়েছে-যা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, মানবিক সংবেদনশীলতার সুস্পষ্ট ব্যর্থতা। অন্যদিকে, গুরুতর অসুস্থতায় আক্রান্ত সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দেওয়া ন্যূনতম মানবাধিকারেরও পরিপন্থী। স্ট্রোক, হৃদ্রোগ, শ্বাসকষ্ট কিংবা ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারাগার শাস্তির স্থান হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই জীবনহানির ঝুঁকিপূর্ণ অমানবিক পরিবেশে পরিণত হতে পারে না।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে-সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে জামিনের বিষয়টি কেন এভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে? পেশাগত বাস্তবতা বিবেচনায় সংবাদকর্মীরা পলাতক হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন না, বরং তাঁদের কাজই জনসমক্ষে স্বচ্ছ থাকা। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তত জামিন একটি স্বাভাবিক অধিকার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তাঁদের সেই ন্যূনতম আইনি সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রসঙ্গও এখানে অনিবার্য। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা এখন পরীক্ষার মুখে। রাষ্ট্র যদি তার প্রতিশ্রুতির প্রতি আন্তরিক থাকে, তবে এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এগুলোই হয়ে উঠেছে বাস্তবতার নির্মম মানদণ্ড।

এখন সময় এসেছে স্পষ্ট, দৃঢ় এবং ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার। প্রথমত, এই চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যদি কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকে, তা অবিলম্বে আদালতে উপস্থাপন করতে হবে; অন্যথায় তাঁদের মুক্তি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁদের যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনের অপপ্রয়োগ রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

কলমকে কারাবন্দী করে কোনো রাষ্ট্র কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। বরং মুক্ত চিন্তা, সমালোচনা এবং সত্য প্রকাশের অবাধ সুযোগই একটি রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল ও মর্যাদাবান করে তোলে। ন্যায়বিচারের পাল্লা যদি ভারসাম্য হারায়, তবে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজকেই বহন করতে হয়। সেই বাস্তবতা অনুধাবন করেই এখন প্রয়োজন সাহসী ও মানবিক পদক্ষেপ-যেখানে আইনের শাসন কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তবেও প্রতিফলিত হবে।
সানা/আপ্র/২৯/৪/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সেতুতে বাঁশ ব্যবহারকারীকে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেতুতে বাঁশ ব্যবহারকারীকে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করুন

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির চিত্রটি প্রায়ই এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়। এ...

গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল, জনপ্রতিনিধির নৈতিক দায় কোথায়
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজী নজরুলের এমপি পদ বহাল, জনপ্রতিনিধির নৈতিক দায় কোথায়

মানুষের জীবন কোনো খেলার বস্তু নয়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা মহল সেই জীবন নিয়ে যা খুশি করবেন, আর রাষ...

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাসের ভাড়া বাড়লো, নৈরাজ্য যেন না বাড়ে
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাসের ভাড়া বাড়লো, নৈরাজ্য যেন না বাড়ে

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূ...

শিশুরা নিখোঁজ হবে, লাশ হয়ে ফিরবে, রাষ্ট্র কি শুধু সংখ্যা গুনবে?
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিশুরা নিখোঁজ হবে, লাশ হয়ে ফিরবে, রাষ্ট্র কি শুধু সংখ্যা গুনবে?

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিবারের পৃথিবী থমকে যায়। সন্তানের ফেরার আশায় উৎকণ্ঠিত বাবা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে