রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কাটতে না কাটতেই ইরান সংঘাতের অভিঘাতে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী থাকা সত্ত্বেও দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম মূলত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের ওপর নির্ভরশীল। ২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর এই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩৯ ডলার পর্যন্ত উঠলেও বছরের শেষে তা কমে ৮৫ ডলারে নেমে আসে। ওই সময় দেশে জ্বালানির দাম বড় পরিসরে বাড়ানো হয়। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেন ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে সমালোচনার মুখে দাম কিছুটা কমানো হলেও তা আন্তর্জাতিক বাজারের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এরপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ শুরু হয়। এতে দাম কিছুটা কমে এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লোকসান কাটিয়ে লাভে ফেরে।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। এ সময়ে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি এবং কোনো ভর্তুকির চাপের কথাও জানানো হয়নি। সাম্প্রতিক ইরান সংঘাতের প্রভাবে স্বল্প সময়ের জন্য দাম ১২০ ডলারে উঠলেও বর্তমানে তা আবার প্রায় ৯০ ডলারে নেমে এসেছে।
এ অবস্থার মধ্যেই দেশে নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কার্যকর হয়েছে। নতুন দরে ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে লোকসান কমানোর যুক্তি দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১ হাজার ৭২৮ টাকা। একই সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন ভাড়া বাড়ছে, কৃষিতে সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর ফলে নিত্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সময়ে দেশে মূল্যবৃদ্ধি জনস্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং এতে জনআস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তিনি একে লুণ্ঠনমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন মনে করেন, সীমিত পরিসরে দাম বাড়ানো বাস্তবসম্মত হতে পারে, তবে সরকারকে কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে যাতে অসাধু চক্র এই সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা করতে না পারে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরো বাড়বে।
সানা/আপ্র/২০/৪/২০২৬