জীবিকার তাগিদে উত্তরবঙ্গ থেকে কুমিল্লা-ফেনী অঞ্চলে কাজের সন্ধানে আসা দিনমজুরদের জন্য যাত্রাপথই হয়ে উঠল মৃত্যুফাঁদ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার হাসানপুর এলাকায় চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন সাতজন, আহত হন আরও ছয়জন।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ভোরে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় নিহতরা সবাই দিনাজপুর জেলার বাসিন্দা। তারা হলেন নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিবপুর গ্রামের মোহাম্মদ আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০), সালেক (৪৫) এবং বিরামপুর উপজেলার ভাইঘর গ্রামের সুমন (২১), আবু হোসেন (৩০), বিষু মিয়া (৩৫) ও আব্দুর রশিদ (৫৫)।
খরচ বাঁচাতে ১৩ জন শ্রমিক চালবোঝাই ট্রাকের ওপর চড়ে কুমিল্লা ও ফেনীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই দুর্ঘটনায় ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে সাতজনের প্রাণ যায়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় আহতদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুন্সীগঞ্জের মেঘনা সেতুর টোলপ্লাজা এলাকায় এসে ট্রাকের চালক স্টিয়ারিং তুলে দেন সহকারীর হাতে। এরপর দাউদকান্দি এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাকটি সড়কের নিচে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার পর দাউদকান্দি হাইওয়ে থানায় নিহতদের মরদেহ রাখা হয়। সেখানে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। নিহত সুমনের ভাই সামিউল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, প্রতিবছর জীবিকার তাগিদে ভাই তার কাছে কুমিল্লায় আসতেন, এবার এসে প্রাণ হারালেন। লাশের পাশে পড়ে থাকা ভাইয়ের জামা হাতে নিয়ে তিনি শোক সামলাতে পারেননি।
একইভাবে নিহত সোহরাব হোসেনের স্বজনরা জানান, দুই মেয়ের ভরণপোষণের জন্য প্রথমবারের মতো শ্রমিকের কাজ করতে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। স্ত্রীর নিষেধ অমান্য করে পথে বের হলেও শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হয় তাকে।
স্থানীয়দের মতে, বাসভাড়া বেশি হওয়ায় অনেক শ্রমিক খরচ বাঁচাতে পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। এতে ঝুঁকি বাড়লেও অভাবের তাড়নায় তারা বাধ্য হন এ পথে যেতে।
নিরাপদ সড়ক চাই সংগঠনের স্থানীয় নেতা আলমগীর হোসেন বলেন, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ নিয়ম কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা গেলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রাথমিকভাবে সড়কের অবস্থা ভালো থাকলেও চালকের দক্ষতা, দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের দাফনের জন্য পরিবারপ্রতি ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সানা/আপ্র/১৪/৪/২০২৬