শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
আগামী ৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাকে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান শুভ্র এ-সংক্রান্ত নোটিস পাঠান বলে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তারিক সিদ্দিককে তার ঠিকানায় পাওয়া যায়নি। তার অধীনস্থ কাউকেও সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে একজন নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতিতে মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে নোটিসটি তার ঠিকানায় লটকিয়ে জারি করা হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ১৯ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারায় তার বক্তব্য ‘শ্রবণ ও গ্রহণের’ জন্য এ নোটিস দেওয়া হয়েছে। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এর ৮৩ নম্বর মামলায় বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাকে ডাকা হয়েছে। মামলাটি করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি।
নোটিসে মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে বলা হয়েছে, তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল সম্প্রসারণ প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তারিক সিদ্দিকের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছে দুদক।
মামলাটির তদন্ত শেষে সাক্ষ্য-স্মারক দাখিলের জন্য সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান শুভ্রকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের মামলায় ১০ আসামি: ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি দেশের তিন বিমানবন্দরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে মোট ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আলাদা চারটি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় আসামি করা হয় ১০ জনকে।
তারিক সিদ্দিক ছাড়াও এ মামলার আসামিরা হলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মুহিবুল হক, সাবেক যুগ্ম সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক ও সুপারিনটেনডেন্ট হাবিবুর রহমান।
অন্য আসামিরা হলেন অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনালের মালিক লুৎফুল্লাহ মাজেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আনাম, প্রকল্প পরিচালক এ কে এম মাকসুদুল ইসলাম এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামী।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামকে। পরে অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনালকে বেআইনিভাবে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে প্রকল্পে যুক্ত করা হয় বলে অভিযোগ করেছে দুদক।
এজাহারে বলা হয়, প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছিল। দুদকের অভিযোগ, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।
একই দিনে শাহজালাল বিমানবন্দরের সিএনএস-এটিএম ব্যবস্থা ও রাডার স্থাপন প্রকল্প থেকে ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরেকটি মামলা করে দুদক। এ ছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ও রানওয়ে নির্মাণ প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা এবং সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি প্রকল্পে ২১২ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে আরো দুটি মামলা করা হয়।
আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগেও মামলা: এরপর ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই তারিক সিদ্দিক, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরো চারটি মামলা করে দুদক।
তারিক সিদ্দিকের বিরুদ্ধে করা মামলায় ২৮ কোটি ৫৯ লাখ ৬৩ হাজার ২৩২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। তার চারটি ব্যাংক হিসাবে ৬২ কোটি ৬০ হাজার ৯৮৩ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও করে দুদক।
২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার পরিবারের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শুরু করে দুদক। এ ছাড়া গুমের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের তালিকায় শেখ হাসিনার সঙ্গে তারিক আহমেদের নামও রয়েছে।
সানা/আপ্র/২৯/৯/২০২৬