জাপানের দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সেই প্রযুক্তির বিস্ময়কর উদাহরণগুলোর একটি হায়াবুসা শিনকানসেন। ই৫ সিরিজের এই ট্রেন টোকিও থেকে হোক্কাইদোর পথে জাপানের মূল দ্বীপ হনশু ও হোক্কাইদোকে সংযুক্ত করেছে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে নির্মিত সেইকান রেল টানেলের মাধ্যমে।
তবে প্রচলিত একটি তথ্যের সংশোধন জরুরি - হায়াবুসা ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার হলেও সেইকান টানেলের ভেতর দিয়ে ট্রেনটি এই গতিতে চলে না। যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন একই অবকাঠামো ব্যবহার করায় টানেলের ভেতর নিয়মিত সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। বিশেষ নির্ধারিত সময়ে মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখে হায়াবুসার গতি সেখানে ঘণ্টায় ২৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
জাপানের পূর্ব রেলওয়ে কোম্পানি ২০১৩ সালের মার্চ থেকে ই৫ সিরিজের হায়াবুসা ট্রেনের সর্বোচ্চ পরিচালনগত গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটারে উন্নীত করে। তবে এই গতি তোহোকু শিনকানসেনের নির্দিষ্ট অংশে প্রযোজ্য।
সমুদ্রের তলদেশের সেইকান টানেল: হনশু ও হোক্কাইদোর মধ্যকার সসুগারু প্রণালির নিচ দিয়ে গেছে ৫৩ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেইকান টানেল। এর ২৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার অংশ সরাসরি সমুদ্রতলের নিচে। টানেলের রেলপথ সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১০০ মিটার নিচে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ২৪০ মিটার গভীরে অবস্থিত।
দীর্ঘ পরিকল্পনা ও কঠিন নির্মাণকাজের পর ১৯৮৮ সালের মার্চে সেইকান টানেল চালু হয়। সে সময় এটি মূলত প্রচলিত রেলপথের জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে ২০১৬ সালের মার্চে হোক্কাইদো শিনকানসেন চালুর পর বুলেট ট্রেনও এই টানেলের মধ্য দিয়ে চলাচল শুরু করে।
সমুদ্রের তলদেশের কঠিন ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ, পানির প্রবল চাপ এবং বিপুল পরিমাণ পানির প্রবাহ মোকাবিলা করে টানেলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। নির্মাণকাজে ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের জন্য পৃথক পাইলট টানেল, মূল রেল টানেলের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও নিষ্কাশনের জন্য সেবা টানেলও তৈরি করা হয়।
টানেলের গভীরতা ও নির্মাণপ্রযুক্তি এটিকে জাপানের প্রকৌশল সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শনে পরিণত করেছে। সমুদ্রতলের নিচে প্রায় ১০০ মিটার এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে ২৪০ মিটার পর্যন্ত গভীরে রেলপথ নির্মাণের ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে হনশু ও হোক্কাইদোর মধ্যে একটি স্থায়ী রেল সংযোগ তৈরি হয়েছে।
গতি, নিরাপত্তা ও আরাম: হায়াবুসা ই৫ সিরিজের ট্রেনের নকশায় উচ্চগতির পাশাপাশি শব্দ কমানো, স্থিতিশীলতা ও যাত্রী আরামের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ট্রেনটির সামনের অংশের দীর্ঘ ও বায়ুগতিবিদ্যাভিত্তিক নকশা সুড়ঙ্গে প্রবেশের সময় সৃষ্ট বায়ুচাপ ও শব্দ কমাতে সহায়তা করে। জাপানের পূর্ব রেলওয়ে কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে হায়াবুসার সর্বোচ্চ পরিচালনগত গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটারে উন্নীত করা হয়।
দীর্ঘ ভ্রমণে যাত্রীদের আরামের জন্য ট্রেনের আসনে পর্যাপ্ত পা রাখার জায়গা, হেলান দেওয়ার সুবিধা, সামঞ্জস্যযোগ্য মাথার কুশন, বিদ্যুৎ সংযোগ ও ট্রে টেবিল রয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য বড় আকারের আধুনিক শৌচাগারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন কামরায় আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং যাত্রীসেবার প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখা হয়েছে।
টোকিও থেকে হোক্কাইদোর পথে এই ট্রেনে ভ্রমণকারী এক ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সমুদ্রের তলদেশের টানেলের প্রকৌশল নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ পথের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এমন একটি টানেলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করা হয়, যা সমুদ্রের নিচে নির্মিত।
প্রকৃতপক্ষে হায়াবুসার বিস্ময় শুধু ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতির সক্ষমতায় নয়; পাহাড়, সমুদ্র, ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও কঠিন ভূতাত্ত্বিক পরিবেশকে জয় করে নির্মিত অবকাঠামোর সঙ্গে এই উচ্চগতির রেলব্যবস্থার সমন্বয়ই জাপানের প্রকৌশল দক্ষতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। সূত্র: এনডিটিভি
সানা/ডিসি/আপ্র/২৭/৯/২০২৬