জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথম গুমের অভিযোগ হিসেবে আলোচিত মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি অবিলম্বে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলেছে, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করতে হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের তাগিদ, মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা খর্ব না করার আহ্বান
লন্ডনের স্থানীয় সময় রোববার (১৯ জুলাই) রাতে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া জেলে মিরাজ শেখকে সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতে দেখা গেছে বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা রয়েছে। এ কারণে এটি গত দুই বছরে বাংলাদেশে প্রথম গুমের ঘটনা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এইচআরডব্লিউর মতে, গুম প্রতিরোধে পূর্বে নেওয়া সংস্কার উদ্যোগ থেকে সরকার সরে আসা উচিত নয়। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা বজায় রাখা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এসব আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং আদালতের আদেশ ছাড়াই আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল। তবে নবনির্বাচিত সরকার ওই অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ হতে দিয়ে নতুন আইনের প্রস্তাব করেছে, যেখানে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে এবং গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই রাখা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বহু মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। সাম্প্রতিক অভিযোগটি দেখাচ্ছে, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যায়। তাঁর মতে, নতুন সরকারের উচিত নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
যেভাবে নিখোঁজ হন মিরাজ
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা জেলে মিরাজ শেখকে আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যান বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।
পরদিন তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোস্টগার্ডের দিগরাজ কার্যালয়ে গেলে প্রথমে জানানো হয়, মিরাজ একটি অভিযানে রয়েছেন। পরে আবার দাবি করা হয়, তিনি কখনোই কোস্টগার্ডের হেফাজতে ছিলেন না।
এদিকে যে চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই দোকানের মালিক জানান, কয়েক দিন পর কোস্টগার্ড পরিচয়ে এক ব্যক্তি এসে তাঁর মোটরসাইকেল নিয়ে যান এবং পরে সেটি আবার ফেরত দেওয়া হয়।
মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন এইচআরডব্লিউকে বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীরা কীভাবে কোস্টগার্ড সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন।
পরিবারের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন ও সংবাদ সম্মেলন করেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরে মিরাজের বাবার আবেদনের পর গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে মিরাজকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অন্যদিকে কোস্টগার্ডের পশ্চিমাঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বরাবরের মতোই মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
সংস্কার অব্যাহত রাখার আহ্বান
এইচআরডব্লিউর মতে, মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্তক্ষমতা সীমিত করা হলে গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্তক্ষমতা পুনর্বহাল করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, গুমের অভিযোগ পুলিশের মাধ্যমে তদন্ত করালে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা ও সুরক্ষা তৈরি হবে না।
সানা/আপ্র/২১/৭/২০২৬