পরিশ্রমী প্রাণী হিসেবে মৌমাছির উদাহরণ বহু পুরোনো। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তারা বেশ দক্ষ-অনেকটা মানুষের মতোই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আমেরিকান বিজ্ঞানভিত্তিক ম্যাগাজিন নটিল ডটআসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষ যেমন কেনাকাটার সময় ফলের রং বা ঘ্রাণ দেখে সেরাটি বেছে নেয়, মৌমাছিরাও ঠিক তেমনি সহজ বা জটিল সংকেত ব্যবহার করে পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত উপযুক্ত ফুল নির্বাচন করে। তাদের এই ‘স্মার্ট’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি বিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করেছে।
মৌমাছি সম্পর্কে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই তাদের এমন কিছু মানসিক দক্ষতার প্রমাণ মিলছে যা অনেকটাই মানুষের আচরণের সঙ্গে মিলে যায়। প্রায় এক শতাব্দী আগে আচরণবিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিশ আবিষ্কার করেছিলেন, মৌমাছিরা বিশেষ ধরনের নাচের মাধ্যমে একে অপরকে ফুলের মধুর অবস্থান জানায়। সেই সময় থেকেই তাদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছিরা চোখে দেখা জিনিস আলাদা করে চিনতে পারে, বিমূর্ত নিয়ম শিখতে পারে এবং প্রাথমিক গণিতও বুঝতে সক্ষম। নতুন গবেষণায় এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে মানুষের মতো পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ।
গবেষণায় দেখা হয়েছে, ‘বাম্বলবি’ কীভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী শেখা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল বদলায়। একটি বাম্বলবি প্রতিদিন শত শত ফুল পরিদর্শন করে। ফলে তাকে বারবার সিদ্ধান্ত নিতে হয় কোন ফুলটিতে মধু পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
জার্মানির ইউনিভার্সিটি অফ কনস্ট্যান্স-এর নিউরোইথোলজিস্ট এবং গবেষণার লেখক আনা স্টোকল বলেন, “বাম্বলবিরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে অসংখ্য সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য এই পতঙ্গটি বিশেষভাবে উপযোগী।”
গবেষণায় প্রথমে মৌমাছিদের নির্দিষ্ট রঙ ও আকৃতির সমন্বয় চিনতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা বুঝতে পারে কোন ফুলে মধু আছে আর কোনটিতে কেবল পানি। উদাহরণ হিসেবে, একটি নীল রঙের তারা-আকৃতির ফুলে রাখা হয়েছিল চিনির দ্রবণ বা মধু, আর একটি হলুদ গোলাকৃতির ফুলে ছিল কেবল পানি।
এরপর গবেষকরা ফুলের রং, আকৃতি ও নকশা অদলবদল করে পরীক্ষা করেন মৌমাছিরা খাবার সংগ্রহের সময় কোন সংকেতকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, সংকেতগুলো পরিবর্তন করার পর মৌমাছিরা আকৃতি বা নকশার চেয়ে রঙের ওপর ভিত্তি করেই বেশি সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন, একটি হলুদ তারা-আকৃতির ফুলের তুলনায় তারা নীল রঙের গোল ফুলকে বেশি বেছে নিয়েছে।
তবে যখন এমন ফুল ব্যবহার করা হয় যেগুলোর রঙের পার্থক্য খুবই সামান্য-যেমন কমলা ও লাল রঙের কাছাকাছি বিভিন্ন আভা-তখন মৌমাছিরা রঙের পরিবর্তে ফুলের আকৃতি ও নকশার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। তখন তারা আগে যেসব আকৃতির ফুলে মধু পেয়েছিল সেগুলোকেই বেশি নির্বাচন করেছে।
গবেষক আনা স্টোকল বলেন, “এভাবে মৌমাছিরা ‘যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই’ নীতি অনুসরণ করে ধারাবাহিকভাবে সেরা ফলাফল বেছে নেয়।”
সহজভাবে বলতে গেলে, মৌমাছিরা যখন পারে তখন রঙের মতো সহজ সংকেত ব্যবহার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ জটিল নকশা বা আকৃতি চিনতে সময় বেশি লাগে। তবে রঙ দিয়ে পার্থক্য করা সম্ভব না হলে তখন তারা বাড়তি সময় নিয়ে আকৃতি বা নকশা বিশ্লেষণ করে।
মানুষও অনেকটা একইভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন বাজারে ফল কিনতে গেলে মানুষ প্রথমে ফলের রঙ দেখে নির্বাচন করে। কিন্তু সব ফলের রঙ একরকম হলে তখন ঘ্রাণ নেওয়া বা হাত দিয়ে টিপে দেখার মতো অতিরিক্ত সংকেত ব্যবহার করে ফলটি কতটা পাকা তা বোঝার চেষ্টা করে।
মৌমাছির ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রায় একই-পার্থক্য শুধু এতটুকু যে তাদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ফুল।
সানা/ডিসি/আপ্র/১১/৩/২০২৬