অনেকেই মনে করেন মন খারাপ মানেই মানসিক চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা বা হতাশা। কিন্তু সব সময় বিষয়টি এতটা সহজ নয়। কখনো কখনো শরীরে প্রয়োজনীয় কিছু ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতিও দীর্ঘদিনের অবসাদ, ক্লান্তি, বিরক্তি এবং সারাক্ষণ মন খারাপ থাকার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র সুস্থ রাখতে যেমন পর্যাপ্ত ঘুম, ব্যায়াম ও মানসিক ভারসাম্য জরুরি, তেমনি প্রয়োজন সঠিক পুষ্টিও; বিশেষ করে ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, ফোলেট (ভিটামিন বি৯) এবং ভিটামিন বি৬-এর ঘাটতি মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভিটামিন ডি কমে গেলে অনেকের মধ্যে অবসাদ, উদ্যমহীনতা এবং বিষণ্নতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অন্যদিকে ভিটামিন বি১২ স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর অভাব হলে শুধু দুর্বলতাই নয়, মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, বিরক্তি এবং দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ফোলেটের ঘাটতি থাকলে ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং আগ্রহহীনতা দেখা দিতে পারে। আবার ভিটামিন বি৬ শরীরে সেরোটোনিন, ডোপামিন ও গামা-অ্যামিনোবিউট্রিক অ্যাসিড-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক তৈরিতে সাহায্য করে। এগুলো আমাদের মেজাজ, ঘুম এবং মানসিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বি৬-এর অভাব হলে অস্থিরতা, খিটখিটে মেজাজ ও উদ্বেগ বাড়তে পারে।
কেন ভিটামিন বি১২ এত গুরুত্বপূর্ণ: ভিটামিন বি১২ এমন একটি পুষ্টি উপাদান, যা শরীর নিজে থেকে তৈরি করতে পারে না। তাই খাবার, প্রয়োজন হলে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে এর চাহিদা পূরণ করতে হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার পরিবর্তে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক খাবার থেকেই ভিটামিন বি১২ গ্রহণ করা ভালো।
সহজলভ্য কয়েকটি খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে বি১২-এর ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। তা হলো-
দুধ: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ২.৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ প্রয়োজন। এক গ্লাস দুধে প্রায় ১.১ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ পাওয়া যায়- যা দৈনিক চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করতে পারে। ল্যাকটোজে অ্যালার্জি না থাকলে প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ পান করা উপকারী।
পালং শাক: নিরামিষভোজীদের জন্য পালং শাক একটি দারুণ পুষ্টিকর খাবার। এতে বি১২-এর পাশাপাশি রয়েছে ফাইবার, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান। নিয়মিত পালং শাক খেলে শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
বিটরুট: বিট শুধু আয়রনের উৎসই নয়, এটি শরীরে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি পূরণেও সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। নিয়মিত বিট খেলে রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে এবং শরীর সতেজ অনুভব করে।
দই ও গ্রিক ইয়োগার্ট: এক বাটি দই বা ইয়োগার্ট থেকে প্রায় ০.৬ থেকে এক মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত ভিটামিন বি১২ পাওয়া যেতে পারে। এতে থাকা প্রোবায়োটিক উপাদান অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং ভিটামিন শোষণেও সহায়তা করে। তাই প্রতিদিনের খাবারে দই যোগ করা একটি ভালো অভ্যাস।
ছানার পানি: ছানা তৈরির পর যে পানি অনেকেই ফেলে দেন, সেটিও পুষ্টিগুণে ভরপুর। এতে থাকা ভিটামিন বি১২ ছাড়াও অ্যালবুমিন ও গ্লোবিউলিন নামের প্রোটিন শরীরে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি হাড় ও কিডনির স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী বলে মনে করা হয়।
পনির: নিরামিষাশীদের জন্য পনির বি১২-এর একটি ভালো উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম পনিরে প্রায় ০.৭ থেকে ০.৮ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ এবং ১৮-২০ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন থাকে। একজন সুস্থ মানুষ পরিমিত পরিমাণে পনির খেলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারে।
শুধু খাবারই যথেষ্ট নয়: যদি দীর্ঘদিন ধরে সারাক্ষণ মন খারাপ থাকে, ক্লান্তি না কাটে, মনোযোগ কমে যায় বা স্মৃতিশক্তির সমস্যা দেখা দেয়; তাহলে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, আয়রন বা অন্যান্য পুষ্টির ঘাটতি আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কারণ সঠিক কারণ জানা গেলে চিকিৎসাও হবে আরও কার্যকর।
সূত্র: হেলথলাইন
কেএমএএ/আপ্র/২৪.০৭.২০২৬