দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রাদুর্ভাব। প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া এই ভাইরাসবাহী রোগটি হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী আসায় সিট এবং আইসোলেশন ব্যবস্থার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করতে হবে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কিছু নির্দিষ্ট বস্তি এলাকায় প্রথম হামের রোগী মেলার খবর এলেও বিষয়টি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে রাজশাহীতে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর পর। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ওইসব শিশুর সবার মৃত্যু হামের কারণে হয়নি। তবে গত ১৯ দিনে ভাইরাসবাহী এই ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে অন্তত ৯৪ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
দেশ থেকে প্রায় বিদায় নেওয়া হাম হঠাৎ এভাবে মহামারি আকারে ফিরে আসবে, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী আকস্মিক এই প্রাদুর্ভাবকে ‘বজ্রপাত’ বা হুট করে এসে পড়া কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে আগামী রোববার (৫ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি নতুন করে টিকার মজুদ বাড়াতে ৬০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংখ্যা এবং সংকটাপন্ন শিশুদের জন্য ভেন্টিলেটর বাড়ানোর কাজ পুরোদমে চলছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানান, “বরাদ্দকৃত টাকার অর্ধেক দিয়ে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা কেনা হচ্ছে। বাকি অর্ধেক টাকার টিকাও যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, তার চেষ্টা চলছে। এছাড়া সারা দেশে যতগুলো জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে, সেখানে আমরা ‘ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ড বা সেন্টার’ চালু করছি।”
তিনি আরো বলেন, হাম ভাইরাসের বিপরীতে সুনির্দিষ্ট কোনো শতভাগ কার্যকর ওষুধ বা ম্যানেজমেন্ট নেই। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং পরীক্ষিত স্ট্যান্ডার্ড মেনে রোগটি ছড়ানো বন্ধ করতে হবে। আর এর একমাত্র প্রধান উপায় হলো— আক্রান্ত রোগীকে সম্পূর্ণ আলাদা বা আইসোলেশনে রাখা।
সরকারের টিকাদান কর্মসূচিকে স্বাগত জানালেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বড় বড় শহরের হাসপাতালে চাপ না বাড়িয়ে চিকিৎসা সেবা দ্রুত উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। অন্যথায় রোগীরা হাসপাতালে আসার পথেই ব্যাপক হারে সংক্রমণ ছড়াবে।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, “একটি নির্দিষ্ট হাসপাতালে অনেক বেশি রোগী ভিড় করলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হবে। তাই স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত এলাকাগুলোর বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সুস্থ বাচ্চাদের থেকে তাদের আলাদা রাখতে হবে।”
তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে আলাদা বা আইসোলেটেড আইসিইউ-এর ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে সাধারণ আইসিইউতে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি থাকা শিশুরা এই অতি সংক্রামক হামের সংস্পর্শে এলে সবার জীবনই বড় ঝুঁকিতে পড়ে যাবে। তবে সঠিকভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী এক মাসের মধ্যে মৃত্যুহার এবং দুই মাসের মধ্যে হামের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এসি/আপ্র/০৪/০৪/২০২৬