ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা গুলশান আরা আক্তার চম্পা। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের গল্প, নির্মাণশৈলী এবং উপস্থাপনার ধরনে এসেছে নানা পরিবর্তন।
বিশেষ করে রুপালি পর্দায় প্রেমের উপস্থাপন নিয়েও চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বর্তমানে অনেকেই নাটক-সিনেমায় প্রেমের গল্পের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন এমন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চম্পা মনে করেন, প্রেমকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে তার মতে, সেই প্রেমের উপস্থাপন অবশ্যই হতে হবে শালীন, সুন্দর ও ইতিবাচক।
এক সাক্ষাৎকারে চম্পা বলেন, পবিত্র প্রেমকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্যে, প্রেম না থাকলে পৃথিবী এত সুন্দর হতো না এবং মানুষের প্রতি মানুষের হৃদয়ের এই টানও থাকত না। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রেমের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অশ্লীলতাকে তিনি সমর্থন করেন না, কারণ এমনটা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চম্পার মতে, নাটক কিংবা সিনেমায় প্রেমের গল্প থাকাটাই স্বাভাবিক, তবে সেই গল্প ঠিক কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নাটক-সিনেমায় প্রেমকে এমনভাবে তুলে ধরা উচিত, যাতে তার মধ্যে কোনো নেতিবাচক দিক না থাকে, যাতে নতুন প্রজন্ম তা দেখে সুশৃঙ্খল ও সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারে। তার এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে পর্দায় প্রেমের উপস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি ভাবনার প্রতিফলনও।
চম্পার ভাষায়, প্রেম মানুষের একেবারেই স্বাভাবিক একটি আবেগ, তাই গল্প থেকে প্রেমকে সরিয়ে না দিয়ে বরং এর ইতিবাচক দিকগুলোই দর্শকের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। সত্তর ও আশির দশকের সিনেমায় প্রেমের উপস্থাপনা কেমন ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে নিজের সময়ের চলচ্চিত্রের স্মৃতি রোমন্থন করেন চম্পা। তিনি বলেন, সেই সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানরাও একসঙ্গে হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন, আর তাতে বাবা-মা কিংবা সন্তান কারোরই কোনো বিব্রতবোধ হতো না।
কারণ তখন প্রেমকে পর্দায় মার্জিত ও পবিত্রভাবে উপস্থাপন করা হতো, যাতে এক ধরনের সৌন্দর্য বজায় থাকত।
চম্পার মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় প্রেমের উপস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে, আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
তিনি বলেন, বর্তমান যুগের পরিবর্তনে পর্দায় প্রেম অনেকটাই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে, আর এ কারণেই হয়তো সিনেমা-নাটকে প্রেমের গল্প নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম হচ্ছে। তাই তিনি মনে করেন, পর্দায় প্রেমকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা গেলে এতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।
উল্লেখ্য, চম্পার অভিনয়জীবনের শুরুটা হয়েছিল মডেলিংয়ের মাধ্যমে। এরপর টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি, এরপর বড় পর্দায় নায়িকা হিসেবে ঘটে তার অভিষেক। ১৯৮৫ সালে পরিচালক শিবলী সাদিকের ‘তিন কন্যা’ সিনেমার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখেন চম্পা। প্রথম সিনেমাতেই দর্শক ও চলচ্চিত্রাঙ্গনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি, এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
ধীরে ধীরে নিজেকে দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের অন্যতম শক্তিমান অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন চম্পা।
নায়িকা চরিত্র থেকে শুরু করে পরবর্তীতে বিভিন্ন বয়স ও ধরনের বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এই গুণী অভিনেত্রী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘তিন কন্যা’, ‘ভেজা চোখ’, ‘কাসেম মালার প্রেম’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘টপ রংবাজ’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘ত্যাগ’, ‘ডিসকো ড্যান্সার’, ‘দেশপ্রেমিক’, ‘অন্য জীবন’, ‘টার্গেট’, ‘খলনায়ক’, ‘লাল দরজা’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শাস্তি’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘মনের মানুষ’ ও ‘ইনস্পেক্টর নটি কে’-এর মতো ছবি। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নিজের অসাধারণ অভিনয়শৈলীর স্বীকৃতিও পেয়েছেন চম্পা।
দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসার পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মাননা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তিনি অর্জন করেছেন সর্বমোট পাঁচবার। এর মধ্যে সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি হিসেবে তিনবার এবং শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দুইবার এই পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
ডিসি/আপ্র/৩০/০৮/২০২৬