দুই দলের রান তখন সমান-সমান। কিন্তু শেষ ওভারের প্রথম বলেই রান আউট হয়ে যান টড মার্ফি। জয়ের জন্য তখন ভিক্টোরিয়া একাডেমির দরকার মাত্র এক রান, হাতে বাকি একটি উইকেট। ম্যাচ সুপার ওভারে গড়ানোর সম্ভাবনায় তখন উজ্জীবিত বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) দল।
বোলার শামীম হোসেন পরের দুই বলেও রান দেননি। তবে চতুর্থ বলে জায়গা বানিয়ে কাভার দিয়ে চার হাঁকিয়ে নাটকীয়ভাবে দলকে জিতিয়ে দেন লিয়াম ব্ল্যাকফোর্ড, আর ফাইনালের টিকিট পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার এই দলটি।
অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে সেমি-ফাইনালের এই লড়াইয়ে ছোট পুঁজি নিয়েও রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ উপহার দিল দুই দল। শেষ পর্যন্ত ১ উইকেটের জয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় ভিক্টোরিয়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন একাডেমি, আর প্রাথমিক পর্বে ছয় ম্যাচের পাঁচটিতে জয় নিয়ে দাপট দেখানো বাংলাদেশ এইচপি দল বিদায় নেয় শেষ চার থেকেই।
ডারউইনে বাংলাদেশ এইচপির পরাজয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায় ব্যাটিং ব্যর্থতা। উড়ন্ত সূচনার পরও নিজেদের পথ হারায় দলটি।
১ উইকেটে ৪৯ রানে থাকা অবস্থা থেকে মাত্র ২১ রানের মধ্যেই হারিয়ে বসে আরও ছয়টি উইকেট। শেষ পর্যন্ত তারা গুটিয়ে যায় ১০১ রানে। এই সামান্য পুঁজি নিয়েও লড়াই ছাড়েননি বাংলাদেশের বোলার-ফিল্ডাররা। আবারও জাদুকরি বোলিং উপহার দেন মোহাম্মদ রুবেল।
তবু শেষ পর্যন্ত ১ বল হাতে রেখেই জয় ছিনিয়ে নেয় ভিক্টোরিয়া একাডেমি। ম্যাচে একটি দুর্ভাগ্যজনক মুহূর্তও ছিল বাংলাদেশের জন্য ব্যাটিংয়ের সময় পায়ে ক্র্যাম্প করায় পরবর্তীতে বোলিং করতে পারেননি পেসার আব্দুল গাফফার সাকলাইন।
তিনি বোলিং করতে পারলে ফলাফল ভিন্নও হতে পারত বলে মনে করা হচ্ছে। পুরো আসরজুড়েই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স দেখানো রুবেল সেমি-ফাইনালেও নিজের ছাপ রেখে যান, মাত্র ১৫ রান খরচায় শিকার করেন ৩ উইকেট। এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে ভর করে পুরো টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে এই রহস্য স্পিনারের ঝুলিতে জমা পড়েছে ২৩ উইকেট, ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন মাত্র ৫.৮২।
টুর্নামেন্টে অন্য কোনো বোলারেরই নেই ১৩টির বেশি উইকেট।
সামান্য পুঁজি নিয়েও দলকে লড়াইয়ের বিশ্বাস জুগিয়েছিলেন রুবেলই। প্রতিপক্ষের ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই বোল্ড করে দেন হ্যা ডিক্সনকে, পিচ করে ভেতরে ঢোকা বলে কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। দ্বিতীয় উইকেটে টম রজার্স ও ক্যাম্পবেল কেলাওয়ে সাবধানী ব্যাটিংয়ে একটি জুটি গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তবে পাওয়ার প্লে শেষে আক্রমণে এসে সেই জুটি ভাঙেন শামীম, স্লগ করতে গিয়ে উইকেট হারান রজার্স।
এরপর ছোট ছোট জুটির ওপর ভর করে এগিয়ে যেতে থাকে ভিক্টোরিয়া একাডেমি, তবে বাংলাদেশও লড়াইয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যায়। ইনিংসের সর্বোচ্চ ২৩ রান করা কেলাওয়েকে ফেরান শামীম। ২০ রানের জুটির পর আবু হায়দার বিদায় করেন ব্লেক ম্যাকডোনাল্ডকে, যদিও এই উইকেটের কৃতিত্ব প্রকৃতপক্ষে প্রাপ্য রুবেলের-ছক্কা হয়ে যাবে বলে মনে হওয়া শটটি সীমানায় অনেকটা লাফিয়ে দুর্দান্ত দক্ষতায় তালুবন্দি করেন তিনি, এরপর মাটিতে পা রেখে অসাধারণ ভারসাম্যও রক্ষা করেন। তারপরও লক্ষ্যের দিকে বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছিল ভিক্টোরিয়া। জয়ের জন্য যখন প্রয়োজন ২১ রান, তখনও হাতে ছিল ৬ উইকেট। কিন্তু এই মুহূর্তেই খেলার চিত্র পাল্টে দেন রুবেল টানা দুই বলে ফিরিয়ে দেন উইল সাদারল্যান্ড ও স্যাম এলিয়টকে।
এরপর ভিক্টোরিয়াকে রীতিমতো চেপে ধরেন রিপন মন্ডল ও রকিবুল হাসান, একের পর এক উইকেটও পড়তে থাকে। এর মাঝে বেশ কিছু জোরাল আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার কখনও একটুর জন্য ব্যাটের কানা স্পর্শ করেনি বল, আবার কখনও ব্যাটের কানায় লেগে বেরিয়ে আসে বাউন্ডারি বা সিঙ্গল। লড়াই চলতে থাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, কিন্তু সামান্য পুঁজি নিয়ে শেষ রক্ষা আর হয়নি বাংলাদেশের। একপ্রান্ত আগলে রেখে শেষ পর্যন্ত দলকে জিতিয়ে দেন ব্ল্যাকফোর্ড।
ম্যাচের শেষটার মতোই নাটকীয় ছিল বাংলাদেশ এইচপির ইনিংসের শুরুও। প্রথম বলেই স্লগ করে থার্ডম্যানে সহজ ক্যাচ তুলে দিয়েও বেঁচে যান হাবিবুর রহমান সোহান। তার সঙ্গী জিসান আলম একই ওভারে দারুণ এক ফ্লিক শটে হাঁকান ছক্কা, প্রথম ওভার থেকেই আসে ১৩ রান।
তবে শুরুতে বেঁচে গেলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি সোহান। তৃতীয় ওভারে সাদারল্যান্ডের লেংথ বলে পুল করার চেষ্টায় কিপারের হাতে ধরা পড়েন তিনি, করেন মাত্র ৫ বলে ৩ রান। উল্লেখযোগ্য বিষয়, স্বীকৃত ক্রিকেটে বাংলাদেশের দ্রুততম ফিফটি ও সেঞ্চুরির রেকর্ডধারী এই ব্যাটসম্যানের জন্য পুরো টুর্নামেন্টটাই কাটে ব্যর্থতায়-৭ ইনিংসে তার সংগ্রহ মাত্র ৮৫ রান, স্ট্রাইক রেট ১১১.৮৪। নতুন ব্যাটসম্যান আরিফুল ইসলাম অবশ্য প্রথম বলেই জায়গা বানিয়ে দৃষ্টিনন্দন শটে এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে হাঁকান ছক্কা, পরের ওভারে মারেন আরও তিনটি চার। ফলে ৪ ওভারেই ৪৬ রান তুলে ফেলে বাংলাদেশ এইচপি।
তবে এরপর থেকেই শুরু হয় দলের উল্টো যাত্রা। নিস্তরঙ্গ পাঁচটি ডেলিভারির পর ওভারের শেষ বলে হাঁটুগেড়ে ফ্লিক-পুলের মিশেলে নিজের প্রিয় শটটি খেলেন আরিফুল, তবে ধরা পড়েন সীমানায়-১০ বলে করেন ১৯ রান। পরের ওভারেই আসে জোড়া ধাক্কা। সোহানের মতো একইভাবে আউট হন জিসান, ২০ বলে করেন ৩০ রান। পরের বলেই স্টাম্পের বাইরে খোঁচা মেরে কিপারের হাতে ধরা পড়েন ইরফান শুক্কুর, যদিও আম্পায়ারের এই সিদ্ধান্তে বেশ অসন্তুষ্ট দেখা যায় বাংলাদেশ এইচপি অধিনায়ককে।
উইকেট পতনের এই ধারা অব্যাহত থাকে পরেও। অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট স্পিনার টড মার্ফির অফ স্টাম্পের বাইরের বল লেগ সাইডে স্লগ করতে গিয়ে আউট হন সাব্বির রহমান, ৮ বলে করেন ৫ রান। বেশ বাইরের একটি বল তাড়া করতে গিয়ে আউট হন শামীম হোসেন, ৭ বলে করেন ৮ রান। ফ্লিক করতে গিয়ে সীমানায় ক্যাচ দিয়ে বসেন রকিবুল হাসান, রানের খাতাই খুলতে পারেননি তিনি। দুই পেস বোলিং অলরাউন্ডার আবু হায়দার (১৮ বলে ১০) ও সাকলাইনও (১০ বলে ৬) বড় কিছু করতে পারেননি। শেষ দিকে রিপন মণ্ডল ও রুবেলের দুটি বাউন্ডারির সৌজন্যে কোনোরকমে একশর গণ্ডি পেরোয় দল। এই সামান্য পুঁজি নিয়েই শেষ পর্যন্ত লড়াই হলো, তবে ম্যাচ জেতা আর হলো না বাংলাদেশ এইচপির।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ এইচপি: ২০ ওভারে ১৪৩/৯ (সোহান ৩, জিসান ৩০, আরিফুল ১৯, সাব্বির ৫, ইরফান ০, শামীম ৮, রকিবুল ০, সাকলাইন ১০, আবু হায়দার ১২, রিপন ৬, রুবেল ৪*; হোকস্ট্রা ২-০-১৪-২, এলিয়ট ৩.১-০-১৪-২, সাদারল্যান্ড ৪-০-১৭-৪, সাইমন্স ২-০-১৭-০, মার্ফি ৩-০-১৪-২, স্টো ৩-০-১৩-০)।
ভিক্টোরিয়া একাডেমি: ১৯.৫ ওভারে ১০৫/৯ (রজার্স ১৮, ডিকসন ০, কেলাওয়ে ২৩, ম্যাকডোনাল্ড ১৫, সাদারল্যান্ড ১৬, ব্ল্যাকফোর্ড ১৯*, এলিয়ট ০, সাইমন্স ৬, হোকস্ট্রা ১, মার্ফি ১; রুবেল ৪-০-১৫-৩, আবু হায়দার ৪-০-৩০-১, রিপন ৪-২-১৬-১, শামীম ৩.৪-০-১৮-২, রকিবুল ৪-০-২৪-১)।
ফল: ভিক্টোরিয়া ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন একাডেমি ১ উইকেটে জয়ী।
ডিসি/আপ্র/৩০/০৮/২০২৬