শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েনের মধ্যে দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অংশ নেওয়ার কথা থাকা একটি সেমিনার শেষ মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেছে। ‘কিছু বিতর্কের’ কারণ দেখিয়ে দিল্লি পুলিশ অনুষ্ঠানটির অনুমতি দেয়নি বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় শনিবার সন্ধ্যায় সেমিনার ও সংবাদ সম্মেলনটি হওয়ার কথা ছিল। এফসিসি সাউথ এশিয়া ও বেলজিয়ামভিত্তিক হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়লগ টু আ পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রসপারিটি’ শীর্ষক এ আয়োজন করছিল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার ও দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানের অনুমতি শেষ মুহূর্তে দেওয়া হয়নি। আয়োজকদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, দিল্লি পুলিশের ‘হস্তক্ষেপের’ কারণে অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে হয়েছে এবং আকস্মিক পরিস্থিতিটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
এফসিসির এক কর্মকর্তা দ্য প্রিন্টকে জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় তিলক মার্গ থানায় গিয়ে অনুষ্ঠানের জন্য নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরে থানার পক্ষ থেকে ওই চিঠিতেই হাতে লিখে জানানো হয়, ‘প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কিছু বিতর্ক থাকায়’ অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। চিঠিতে থানার সিল ও কর্মকর্তার স্বাক্ষরও ছিল।
তবে দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শচীন শর্মা পুলিশি হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এফসিসির কোনো প্যানেল আয়োজনের জন্য পুলিশের অনুমতির প্রয়োজন নেই এবং পুলিশ অনুষ্ঠানটিতে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।
আলোচকদের তালিকায় আওয়ামী লীগ নেতা: সেমিনারের প্রচারে আয়োজকদের প্রকাশিত পোস্টারে ১০ জন আলোচকের নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম মাহমুদ। আরো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি নূরুন নবী, রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী রবি আলম এবং নেপালের শিশু অধিকারকর্মী সুন্দর ঘিমিরে।
এ ছাড়া আলোচকদের তালিকায় ছিলেন ভারতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি, সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ, চেক প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ওন্দ্রেজ দোস্তাল, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আসিফ ইকবাল, এফসিসি-আইএপিসির চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ এবং হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের মহাসচিব এ এফ এম গোলাম জিলানী।
ভিসা না পাওয়ায় জিলানী ভারতে যেতে পারেননি। দ্য ওয়্যারকে তিনি বলেন, তাঁর ভিসা প্রক্রিয়াধীন ছিল এবং অনুষ্ঠানটি কেন বন্ধ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের কোনো বিষয় নিয়ে ছিল না দাবি করে জিলানী বলেন, এটি ইউরোপ ও এশিয়ার সম্পর্ক নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল। হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট-এমন দাবিও তিনি অস্বীকার করেন।
তাঁর দাবি, সংগঠনটি কোনো রাজনৈতিক দল বা দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়; মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন ও শিক্ষা নিয়ে কাজ করে।
তবে দ্য ওয়্যার জানিয়েছে, সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদন এবং ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তথ্যে হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সঙ্গে ইউরোপে আওয়ামী লীগের যৌথভাবে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজনের তথ্য রয়েছে।
কেন বন্ধ হলো, স্পষ্ট করেনি পুলিশ: অনুষ্ঠানের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে দিল্লি পুলিশ বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। পুলিশের নথিতে শুধু ‘কিছু বিতর্কের কারণে’ অনুষ্ঠানটির অনুমতি না দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এফসিসির প্রেসিডেন্ট ওয়ায়েল আওয়াদ বলেন, অনুষ্ঠানটি অংশীদারত্ব ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ছিল। তবে পুলিশ কেন অনুমতি দেয়নি, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
এফসিসি-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, গত ৫ আগস্ট একই ক্লাবে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের পর বাংলাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতাকে বক্তা করা এবং রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীর উপস্থিতির কারণে এবারও দিল্লির আপত্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে ওই সূত্রের ধারণা।
শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর টানাপড়েন: গত ২৯ আগস্টের এ ঘটনা শেখ হাসিনার ৫ আগস্টের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের ২৪ দিন পর ঘটল। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে যাওয়ার পর দিল্লিতে কোনো অনুষ্ঠানে সেটিই ছিল শেখ হাসিনার প্রথম বক্তৃতা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে এফসিসি আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে অডিও কলে যুক্ত হয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা। তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।
পরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাঁর দল আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের আগে বাংলাদেশ দিল্লির সহযোগিতা চেয়ে বলেছিল, ভারতের মাটি ব্যবহার করে তিনি যেন রাজনৈতিক বক্তব্য বা এমন কোনো কর্মকাণ্ড করতে না পারেন, যা বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
ভারত সরকার তখন জানিয়েছিল, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, এটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকার একমত নয়।
তবে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, ভারতের মাটিতে তাঁকে এমন একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর।
একই সঙ্গে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বাংলাদেশের অনুরোধের কোনো জবাব না পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরে ঢাকা।
শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও আলোচনায় পড়ে। ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁর সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে ৫ আগস্টের ঘটনার পর বাংলাদেশ জানায়, সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই পরিবেশ তৈরির জন্য ভারতকে শেখ হাসিনাসহ অন্য পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিদেরও ফেরত দেওয়ার দাবি জানায় ঢাকা।
এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা ‘প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার আওতায়’ পর্যালোচনা করছে।
এ অবস্থায় দিল্লিতে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বক্তাদের অংশ নেওয়ার কথা থাকা সেমিনারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই দেশের সাম্প্রতিক সম্পর্কের টানাপড়েনে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে অনুষ্ঠানটি সরাসরি বাংলাদেশকেন্দ্রিক ছিল না এবং দিল্লি পুলিশও বাংলাদেশের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্রের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেনি।
সানা/আপ্র/৩০/৮/২০২৬