জীবনের প্রায় পুরোটা সময় বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে কাটিয়েছেন রনজিলা পারভীন। সকালবেলা স্কুলে এসে শিশুদের নিয়ে বসতেন। বিকেলে স্কুল ছুটি শেষে শিশুদের সঙ্গেই বাড়ি ফিরতেন। শিশুদের সঙ্গে ছিল তার দীর্ঘদিনের সখ্য।
শিশুরাও তাকে মায়ের মতো ভালোবাসত। রোববারও তারা আশা করেছিল, স্কুলে গিয়ে রনজিলা পারভীন ম্যাডামকে তার কক্ষে দেখবে। কিন্তু সেদিন স্কুলে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল নির্মম এক বাস্তবতা।
দুপুরে স্কুলের মাঠে পৌঁছায় একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। তাতে নীরব, নিথর হয়ে শুয়ে ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন।
ছোট ছোট শিশুরা কাঁদতে কাঁদতে অ্যাম্বুলেন্সের কাচের ফাঁক দিয়ে শেষবারের মতো প্রিয় ম্যাডামের মুখ দেখছিল। তাদের চোখে ছিল অশ্রু। আর কোনোদিন ম্যাডাম ক্লাসে আসবেন না, আদর করে কাছে ডাকবেন না-এই বাস্তবতা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না তারা।
কাঁদছিলেন রনজিলার সহকর্মীরাও। অভিভাবক ও স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীরাও তাকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন। সবার চোখেই ছিল জল। নিজেদের মধ্যে রনজিলাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন তারা।
চোখের চিকিৎসার জন্য শনিবার ভোরে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিলেন রনজিলা পারভীন (৫৭)। রিকশায় করে হাসপাতালে যাওয়ার পথে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী তার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান।
পরে তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রনজিলা পারভীন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। স্কুলটি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে। তার বাড়ি উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে। তিনি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় জেলা খাদ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের পাশে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন।
১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন রনজিলা পারভীন। পরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। বগুড়া শহর থেকে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
রনজিলার স্বামী আব্দুল মতিন বগুড়া নিউ মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী। তাদের একমাত্র মেয়ে রাইশা বগুড়া ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ঢাকায় ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার গভীর রাত ২টার দিকে রনজিলা পারভীনের মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছায়। রোববার দুপুর ২টায় বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্বামীর বাড়ি গাবতলীর দাড়াইল গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তাকে দাফন করা হয় বলে জানান রনজিলার বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম।
মূল সন্দেহভাজনসহ দুজন গ্রেফতার: জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্কুলশিক্ষিকা রনজিলা পারভীন নিহত হওয়ার মামলার মূল সন্দেহভাজন মো. মোশারফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ওরফে প্যারা পনি এবং তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-২। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাব জানিয়েছে, অভিযুক্ত প্যারা পনির বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩টি মামলা রয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান। র্যাব জানায়, নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় রোববার তারা জানতে পারে, ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে নিহত স্কুলশিক্ষিকা রনজিলা পারভীন (৫৫) হত্যা মামলার সন্দেহভাজন ছিনতাইকারীরা রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকায় অবস্থান করছে।
এর ভিত্তিতে র্যাব-২-এর একটি দল সেখানে অভিযান চালিয়ে হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি ও ছিনতাইকারী চক্রের মূল হোতা মো. মোশারফ হোসেন পনি ওরফে পনি গাজী ওরফে প্যারা পনিকে তার সহযোগী সেড্রিক এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ আটক করে। হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের আটক করা হয়।
ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির মালিক রাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার দিন মোটরসাইকেলটি পনি গাজীর হেফাজতে ছিল। নিহতের স্বামী আব্দুল মতিনও ঘটনাস্থলে ওই মোটরসাইকেলটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
র্যাব জানায়, শনিবার (২৯ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে স্বামীর সঙ্গে গাবতলী থেকে রিকশাযোগে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে যাচ্ছিলেন।
রিকশাটি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী পেছন থেকে রনজিলা পারভীনের ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় আঘাত পান। পরে তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী আব্দুল মতিন অজ্ঞাতনামা দুই ছিনতাইকারীকে আসামি করে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, মামলার মূল সন্দেহভাজন পনি গাজী একজন পেশাদার ছিনতাইকারী এবং একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত। দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজধানীর তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক বিক্রি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মোট ১৩টি মামলা রয়েছে।
র্যাব জানায়, পনির বিরুদ্ধে ডিএমপির হাতিরঝিল, আদাবর ও কাফরুল থানায় মাদকের তিনটি মামলা রয়েছে। ভাটারা, মোহাম্মদপুর, কাফরুল, বাড্ডা ও শাহজাহানপুর থানায় চুরি, সিঁধেল চুরি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ছয়টি মামলা রয়েছে। এছাড়া আদাবর, খিলগাঁও ও কামরাঙ্গীরচর থানায় চুরি ও সিঁধেল চুরির তিনটি মামলা রয়েছে। ঢাকার বাইরে চাঁদপুর মডেল থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির একটি মামলা রয়েছে।
গ্রেফতার দুজনের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/৩০/৮/২০২৬