চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি স্বাক্ষর বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। চুক্তির পক্ষে সরকারের যুক্তি-আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, নতুন বিনিয়োগ এবং পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি। অন্যদিকে, শ্রমিকদের আপত্তি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবাদে উঠে এসেছে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে আবেগ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন ও জনস্বার্থের নিরঙ্কুশ সুরক্ষা।
৮ অক্টোবর স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব পালন করবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, টার্মিনালের জমি, অবকাঠামো ও মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা প্রদান এবং প্রথম ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনার কথাও প্রকাশিত হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কার্যক্ষমতা ও পণ্য পরিবহনের গতি বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বিনিয়োগের অঙ্ক বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি দিয়ে কোনো চুক্তির সাফল্য নির্ধারিত হয় না; প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করে রাষ্ট্র কী সুবিধা পাচ্ছে, কী ঝুঁকি নিচ্ছে এবং চুক্তির শর্ত কতটা জনবান্ধব তার ওপর।
নিউমুরিং টার্মিনালের গুরুত্বও বিবেচনায় রাখা জরুরি। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে এর পরিচালনায় সামান্য বিঘ্নও আমদানি-রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, পণ্য উৎপাদন এবং বাজারদরের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একই কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে একতরফা নির্ভরতা, মাশুল নির্ধারণ, মুনাফা বণ্টন, নিরাপত্তা ও বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম দায়িত্ব চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করা। বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, রাজস্ব ভাগাভাগি, ন্যূনতম পণ্য পরিবহনের নিশ্চয়তা, পরিচালন ব্যয়, মাশুল পরিবর্তনের ক্ষমতা, কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা এবং চুক্তি বাতিলের শর্ত স্পষ্ট করতে হবে। স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি পর্যালোচনা করে জনগণকে জানাতে হবে, দেশীয় ব্যবস্থাপনার বিকল্পের তুলনায় এই চুক্তিতে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা কতটুকু। প্রয়োজন হলে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে চুক্তির জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দিকগুলো পর্যালোচনার ব্যবস্থাও করা উচিত।
শ্রমিকদের উদ্বেগকে অবজ্ঞা করে টেকসই বন্দর পরিচালনা সম্ভব নয়। চুক্তির বিরোধিতা করলেই কাউকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলা যেমন অনুচিত, তেমনি আন্দোলনের নামে বন্দর অচল করে আমদানি-রপ্তানি ও সাধারণ মানুষের জীবিকা বিপন্ন করাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপ, চাকরি ও শ্রম অধিকার রক্ষার লিখিত নিশ্চয়তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বাধীন ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিবাদ মোকাবিলায় বলপ্রয়োগের বদলে যুক্তি, স্বচ্ছতা ও আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সবশেষে বুঝতে হবে, বন্দর কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়; এটি দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার। বিদেশি দক্ষতা গ্রহণে আপত্তির কারণ নেই, যদি তার প্রতিটি শর্ত বাংলাদেশের স্বার্থে পরীক্ষিত হয়। সরকারকে নিয়মিত কর্মদক্ষতা, রাজস্ব আয়, সেবার মান ও শ্রম অধিকার বিষয়ে প্রকাশ্য প্রতিবেদন দিতে হবে এবং চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নের নামে অন্ধ আস্থা কিংবা সার্বভৌমত্বের নামে সব সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান-দুটিই ভুল পথ। সঠিক পথ হলো, স্বচ্ছ চুক্তি, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় তদারকি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি। বন্দরের সাফল্য তখনই জাতীয় অর্জন হবে, যখন তার সুফল দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে বাস্তবভাবে প্রতিফলিত হবে।
সানা/আপ্র/১০/১০/২০২৬