একসময় যে কণ্ঠে সরব থাকত সংবাদকক্ষ, সহকর্মীদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডায় মুখর থাকতো বরিশাল প্রেস ক্লাব-সেই সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি এবার নীরব, নিথর। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের প্রিয় সহকর্মী ও স্বজনদের কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি। শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বরিশাল প্রেস ক্লাবে ভিড় করেন সহকর্মী, সাংবাদিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ। ফুলেল শ্রদ্ধা আর অশ্রুসিক্ত বিদায়ে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল কার্যালয় থেকে পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার দুপুরে মরদেহ নেওয়া হয় বরিশাল প্রেস ক্লাবে। সেখানে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান সিটি প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। প্রিয় সহকর্মীকে শেষবারের মতো দেখতে এসে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
পরে মরদেহ নেওয়া হয় নগরীর কালীবাড়ি রোডের বাসায়। সেখানে স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। স্বজনদের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের পর বিকালে নগরীর কাউনিয়া মহাশ্মশানে পুলক চ্যাটার্জির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
পুলক চ্যাটার্জি দীর্ঘ সময় দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর তিনি নিয়মিত কর্মহীন ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। এরপরও সাবেক কর্মস্থলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। মাঝে মধ্যেই সমকাল কার্যালয়ে এসে বসতেন, পত্রিকা পড়তেন। কার্যালয়ে প্রবেশের একটি চাবিও তাঁর কাছে ছিল বলে সহকর্মীরা জানিয়েছেন।
শুক্রবারও তিনি সেই পরিচিত কর্মস্থলেই এসেছিলেন। পরে সেখান থেকেই তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি হাতে লেখা চিরকুট উদ্ধার করে পুলিশ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পাঁচটি চিরকুট পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে স্ত্রী, মেয়ে, ছোট ভাই, সহকর্মী এবং প্রশাসনের উদ্দেশে লেখা চিরকুট ছিল বলে জানা গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল মামুন উল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার আলামত ও চিরকুটগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণা সামনে এলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হচ্ছে না।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে বরিশালের সাংবাদিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি শুধু একজন সংবাদকর্মী হিসেবেই নয়, সহকর্মীদের কাছে ছিলেন পরিচিত ও আপনজন। তাঁর কর্মস্থলেই শেষবার তাঁকে পাওয়া, এরপর সেই কর্মস্থল থেকে মরদেহ নিয়ে সহকর্মীদের চোখের জলে বিদায়-পুরো ঘটনাটিই বরিশালের সাংবাদিক সমাজে গভীর বেদনার স্মৃতি হয়ে রইল।
সানা/১৩/৯/২০২৬