রাজধানীতে শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত পৃথক স্থান থেকে নারীসহ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে তিনজন পুরুষের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। একজন আইনজীবীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ভাড়া বাসা থেকে। সবচেয়ে নৃশংস ও রহস্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে আদাবরে-একটি খাল থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক নারীর মাথা, দুই হাত ও দেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর পা এখনো পাওয়া যায়নি।
একই দিনে রাজধানীর চার প্রান্তে পৃথক পাঁচ মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নগরের নিরাপত্তা ও জনজীবন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও সব ঘটনাকে একই ধরনের অপরাধ বা হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শাহবাগে উদ্ধার দুই পুরুষ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপেক্ষাগারের পাশ থেকে উদ্ধার ব্যক্তিকে ভবঘুরে বলে ধারণা করছে পুলিশ। লালবাগের আইনজীবীর মৃত্যুর কারণ নিয়েও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আদাবরে খণ্ডিত নারী মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের স্পষ্ট আলামত মিলেছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে পুরান ঢাকার লালবাগের শহীদনগরের বউবাজার ৩ নম্বর গলির ১০/১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলার ভাড়া বাসা থেকে মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নামে এক আইনজীবীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই কক্ষে একাই থাকতেন। বাড়ির মালিক মনির হোসেন জানান, চলতি মাসেই ৪ হাজার টাকা ভাড়ায় আনোয়ার একটি কক্ষে উঠেছিলেন।
পুলিশের ধারণা, দুই থেকে তিন দিন আগে আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা স্ট্রোকের সম্ভাবনার কথাও প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। অন্য একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ৪৫ বছর বয়সী সাবেক আইনজীবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আনোয়ার হোসেন জজ কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন অ্যানেক্স ভবনের প্রথম তলায় ২১৪ নম্বর কক্ষে তাঁর চেম্বার রয়েছে। পুলিশ তাঁর সঙ্গে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্স উদ্ধার করেছে। লাইসেন্সে ঠিকানা হিসেবে ৩১২ নম্বর জগন্নাথ সাহা রোড উল্লেখ রয়েছে। সেটি যাচাই করে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে পুলিশ।
লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জামিল হোসেন বলেন, আনোয়ার হোসেন জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট ছিলেন এবং ওই বাসায় ব্যাচেলর হিসেবে থাকতেন। তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া গেছে। সেটি যাচাই করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
এরপর রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে উদ্ধার হয় দুই অজ্ঞাত পুরুষের মরদেহ। শনিবার বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ফটকের সামনের ফুটপাত এবং কদম ফোয়ারা মোড় এলাকা থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ বছর এবং অন্যজনের প্রায় ৪৫ বছর।
স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশ বলছে, দুজনই ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন এবং অসুস্থতাজনিত কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তাঁদের পরিচয় শনাক্তে সিআইডির ফরেনসিক টিমকে খবর দেওয়া হয়েছে।
এদিকে শনিবার দুপুরের দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপেক্ষাগারের পাশ থেকেও এক অজ্ঞাত পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর বয়স আনুমানিক ৭০ বছর। তিনিও ভবঘুরে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢামেক হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আইয়ুব আলী ওই ব্যক্তিকে অপেক্ষাগারের সামনে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিকাল সোয়া ৩টার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়।
তবে পাঁচটি ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে আদাবরের ঘটনা। শনিবার বিকেলের দিকে আদাবর ১০ নম্বরের হাক্কার মোড় এলাকার একটি খাল থেকে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বস্তাবন্দি অবস্থায় পাওয়া দেহের অংশগুলোর মধ্যে ছিল মাথা, দুই হাত ও পা-বিচ্ছিন্ন দেহ। তাঁর দুই পা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান, স্থানীয়দের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তাবন্দি খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে। নারীর পরনে ছিল মেরুন রঙের জামা ও জলপাই রঙের পায়জামা। জামার হাতাসহ বিচ্ছিন্ন দুই হাত এবং বিচ্ছিন্ন মাথাসহ দেহের অংশ একটি কালো ব্যাগে ভরে কে বা কারা খালে ফেলে গেছে। নারীর পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।
কে বা কারা ওই নারীকে হত্যা করেছে, কেন হত্যা করা হয়েছে, কোথায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছে এবং মরদেহের বাকি অংশ কোথায় - এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। নিহত নারীর পরিচয় শনাক্তে সিআইডির ফরেনসিক টিমও কাজ করছে।
সানা/১৩/৯/২০২৬