ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার প্রচলিত সীমানার প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার নতুন সীমানা ফলক নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। পুরোনো সীমানা ফলক ও দীর্ঘদিনের প্রচলিত সীমানা উপেক্ষা করে নতুন করে সীমানা নির্ধারণের অভিযোগ তুলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রশাসন।
সম্প্রতি ঘোড়াঘাট-পলাশবাড়ী আঞ্চলিক সড়কের করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতু-সংলগ্ন এলাকায় নতুন সীমানা ফলক নির্মাণকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক আব্দুল আল মামুন কাওসার শেখ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামসহ স্থানীয় শতাধিক বাসিন্দা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত সীমানা এবং আগে স্থাপন করা সীমানা ফলককে পাশ কাটিয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলার দিকে প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে গিয়ে পলাশবাড়ী উপজেলার নতুন সীমানা ফলক নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সরকারি নথিতে দুই উপজেলার সীমানা নির্ধারিত থাকার পরও কীভাবে সেই সীমানার বাইরে গিয়ে নতুন করে পলাশবাড়ীর সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, সীমানায় কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকলে তার পক্ষে সরকারি আদেশ, প্রজ্ঞাপন বা গেজেট রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো সীমানা, সরকারি নথি, মৌজা মানচিত্র ও ভূমি রেকর্ড যাচাই করে প্রকৃত সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সরেজমিনে স্থানীয়দের দেখানো তথ্য অনুযায়ী, করতোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতু পার হওয়ার আনুমানিক ১০০ মিটার পূর্ব দিকে ঘোড়াঘাট উপজেলা শেষ হয়ে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা শুরু হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই একটি পুরোনো সীমানা ফলক রয়েছে। এতদিন সেটিই দুই জেলা ও উপজেলার সীমানা নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল বলে জানান স্থানীয়রা।
সাবেক ঘোড়াঘাট পৌর কাউন্সিলর আব্দুল মমিন বলেন, আগে থেকেই দুই উপজেলার সীমানা নির্ধারিত রয়েছে। এরপরও কাউকে না জানিয়ে পুরোনো সীমানা ফলককে পাশ কাটিয়ে পৌরশহরের প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরে নতুন করে সীমানা ফলক তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুরোনো সীমানা ফলক অনুযায়ী করতোয়া সেতু, সেতুর ওপারের একটি শ্মশানঘাট এবং সড়কের পাশের কয়েকটি রেস্তোরাঁ ঘোড়াঘাট পৌরসভার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু নতুন সীমানা কার্যকর হলে সেতু, শ্মশানঘাট, কয়েকটি রেস্তোরাঁ এবং সেতুর এ পাশের কয়েকটি বসতবাড়িও পলাশবাড়ী উপজেলার সীমানার মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘোড়াঘাট উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক আব্দুল আল মামুন কাওসার শেখ বলেন, পূর্বের সীমানা ফলককে বিবেচনায় রেখে প্রশাসনিক সীমানাসংক্রান্ত নথি, মৌজা মানচিত্র ও ভূমি রেকর্ড পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে সার্ভেয়ার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হবে।
ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন বলেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ তিনি সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গেও কথা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হবে। আশা করা হচ্ছে, এর একটি সুষ্ঠু সমাধান হবে।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের আপত্তি রয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। সবার সঙ্গে আলোচনা করে এর কোনো সমাধান করা যায় কি না, তা দেখা হবে।
তিনি বলেন, যেহেতু স্থাপনাটি ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে, তাই অর্থের অপচয় না করে এক পাশে ‘স্বাগতম ঘোড়াঘাট’ এবং অন্য পাশে ‘স্বাগতম পলাশবাড়ী’ লেখা যায় কি না, সে বিষয়েও সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে স্থানীয়রা না চাইলে সেটিও করা হবে না।
প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়দের বাধার মুখে সীমানা ফলক নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। তবে সীমানা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিষয়টি দ্রুত পরিষ্কার করা না হলে ভবিষ্যতে শুধু সীমানা নিয়ে বিতর্কেই এটি সীমাবদ্ধ থাকবে না। জমির মালিকানা নির্ধারণ, ভূমি রাজস্ব আদায়, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে সরকারি নথি, মৌজা মানচিত্র, ভূমি রেকর্ড ও বিদ্যমান সীমানা সরেজমিনে যাচাই করে দ্রুত প্রকৃত প্রশাসনিক সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দুই উপজেলার প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানানো হয়েছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১২/৯/২০২৬