নারায়ণগঞ্জে ফেরার পথে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে বাসে উঠেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। কিছু দূর যাওয়ার পরই তাঁর সন্দেহ হয়, বাসের কয়েকজন যাত্রী আসলে যাত্রী নন। কিছুক্ষণ পর সেই সন্দেহই সত্যি হয়। সাধারণ যাত্রীদের টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে বাস থেকে নামিয়ে দেয় ডাকাত দলের সদস্যরা। এরপর জাহাঙ্গীরকে বাসের ভেতর জিম্মি করে বুকে ছুরি ঠেকিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
বাঁচার আশায় ছোট ভাই ও সহকর্মীদের ফোন করে জাহাঙ্গীর বিকাশের মাধ্যমে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন। তাঁর এটিএম কার্ডও ছিনিয়ে নেয় ডাকাতেরা। কিন্তু এতেও মুক্তি মেলেনি। বাকি টাকার জন্য তাঁকে জিম্মি রেখেই বাসটি ঢাকার আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত গিয়ে আবার ময়মনসিংহের দিকে ফিরতে থাকে।
র্যাব-১৪-এর ময়মনসিংহের একটি দল প্রযুক্তির সহায়তায় বাসটির অবস্থান শনাক্ত করে রাত ১২টার দিকে নগরের দিঘারকান্দা এলাকায় অভিযান চালিয়ে জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার এবং ডাকাত দলের মূল হোতা জাবেদ ইকবাল ওরফে বিহারি বাদলকে (৪০) আটক করেছে। এ সময় বাস থেকে দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তবে দলের অন্য সদস্যরা পালিয়ে যায়।
র্যাব সূত্রে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর তাঁর ভাই শাহারুল আলমকে ফোন করে দ্রুত দুই লাখ টাকা নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বরে পাঠাতে বলেন। এ সময় তিনি তাঁকে বলেন, ‘বেঁচে থাকলে তোর টাকা ফেরত দিয়ে দেবো।’ তাঁর কথায় সন্দেহ হলে শাহারুল বিষয়টি র্যাবকে জানান। এরপর বিকাশে টাকা পাঠানোর সূত্র ধরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বাসটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
র্যাবের ময়মনসিংহ কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীর ভাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসটির গতিবিধি অনুসরণ করা হয়। বাসটি ত্রিশাল পেরিয়ে ময়মনসিংহ বাইপাসের দিকে আসার সময় দুটি তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। প্রথম তল্লাশিচৌকি দেখে বাসটি দ্রুতগতিতে সেটি ভেঙে পালিয়ে যায়। পরে দ্বিতীয় তল্লাশিচৌকির সামনে বাসটি থামানো হলে ডাকাত দলের সদস্যরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিছু দূর যাওয়ার পর জাবেদ ইকবালকে আটক করা হয়। বাসের ভেতর থেকে জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার করা হয়।
আটক জাবেদ ইকবাল ময়মনসিংহ নগরের পাটগুদাম মদের ডিপো এলাকার বাসিন্দা। র্যাবের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ১০টির বেশি ডাকাতির মামলা রয়েছে। এর আগেও তিনি র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সহযোগীদের নাম জানিয়েছেন। তাঁদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। আটক জাবেদকে থানায় হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে র্যাব।
ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলম সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্সের নারায়ণগঞ্জ ইউনিটের ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। তাঁর বাড়ি বরগুনার আমতলী এলাকায়। তিনি জানান, অফিসের কাজে ভালুকায় গিয়েছিলেন। কাজ শেষে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে নারায়ণগঞ্জ ফেরার উদ্দেশে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে বাসে ওঠেন।
জাহাঙ্গীর বলেন, বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পর তিনি বুঝতে পারেন, দুই-তিনজন সাধারণ যাত্রী ছাড়া বাকি সাত-আটজনই ডাকাত দলের সদস্য। সাধারণ যাত্রীদের মুঠোফোন ও টাকা কেড়ে নিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাসের জানালা ও পর্দা বন্ধ করে তাঁকে মারধর শুরু করা হয়। বুকে ছুরি ধরে পাঁচ লাখ টাকা না দিলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে বিকাশে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা এনে দিলেও ডাকাতেরা পুরো টাকার জন্য তাঁকে জিম্মি করে রাখে।
জাহাঙ্গীরের ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা আদায়ের জন্য বাসটি আবদুল্লাহপুর ঘুরে আবার ময়মনসিংহের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এ অবস্থায় তিনি ভাই ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সহযোগিতা চান। তাঁর ভাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরে র্যাব অভিযান চালায়।
র্যাব-১৪-এর কোম্পানি কমান্ডার মো. সামসুজ্জামান বলেন, চলন্ত বাস ব্যবহার করে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছিল। আটক জাবেদ ইকবালের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সানা/ডিসি/১২/৯/২০২৬