পায়ের ঘুঙুরে ছন্দ, নৃত্যের মুদ্রায় গল্প আর মঞ্চজুড়ে শিল্পের আবহ - এভাবেই ২৫ বছরের পথচলাকে উদ্যাপন করছে বাংলাদেশের অন্যতম সুপরিচিত নৃত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নৃত্যাঞ্চল। নৃত্যচর্চার দীর্ঘ এই যাত্রার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে বসেছে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য উৎসব। ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বরের এই আয়োজনে নৃত্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস, শিল্পীদের সৃজনশীলতা এবং দীর্ঘদিনের পথচলার স্মৃতি।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়, নৃত্যাঞ্চলের রজতজয়ন্তী উৎসব হয়ে উঠেছে দেশের নৃত্যচর্চার নানা ধারা ও প্রজন্মের শিল্পীদের মিলনমেলা। উৎসবের আয়োজনে রয়েছে বর্ণাঢ্য র্যালি, শিশু-কিশোরদের বিশেষ নৃত্যানুষ্ঠান, লোকনৃত্য, সৃজনশীল ও ধ্রুপদী নৃত্যের পরিবেশনা এবং নৃত্যাঞ্চলের ২৫ বছরের কর্মকাণ্ড, অর্জন ও স্মরণীয় মুহূর্তের বিশেষ প্রদর্শনী।
১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। এতে নৃত্যাঞ্চলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কলাকুশলীদের পাশাপাশি অংশ নেন প্রতিষ্ঠানের দুই পরিচালক, দেশের বরেণ্য নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যপরিচালক শামীম আরা নীপা ও শিবলী মোহাম্মদ। র্যালি শেষে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হবে শিশু-কিশোরদের ব্যতিক্রমধর্মী নৃত্যানুষ্ঠান ‘ছড়ায় ছন্দে নৃত্যমালা’। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
‘ছড়ায় ছন্দে নৃত্যমালা’র শুরুতেই নুপুর বেঁধে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন স্টালিন, বরেণ্য নৃত্যশিল্পী আমানুল হক, কাজল ইব্রাহিম, লুবনা মারিয়ম, ড. সোমা মুমতাজ, বেলায়েত হোসেন খান ও আনিসুল ইসলাম হিরু এবং নৃত্যাঞ্চলের পরিচালক শামীম আরা নীপা ও শিবলী মোহাম্মদ।
শিশুতোষ ছড়া ও শিক্ষণীয় বিষয়কে উপজীব্য করে নির্মিত এই আয়োজনের বিশেষত্ব এর বিপুলসংখ্যক শিশু-কিশোর শিল্পীর অংশগ্রহণ। ছড়া, ছন্দ, শিক্ষা ও আনন্দের সমন্বয়ে সাজানো পরিবেশনায় নৃত্যাঞ্চলের ৪০০-এর অধিক শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী অংশ নেবেন। শিশুদের চোখে নৃত্যের ভাষায় গল্প ও আনন্দকে মঞ্চে তুলে ধরবেন তারা। অনুষ্ঠানটির নৃত্য পরিচালনা করবেন শামীম আরা নীপা। সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবেন শিবলী মোহাম্মদ।
উৎসবের পর্দা নামবে ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে। একই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে সমাপনী আয়োজন ‘নৃত্যমালিকা’। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
লোকনৃত্য, সৃজনশীল ও ধ্রুপদী নৃত্যের সমন্বয়ে সাজানো ‘নৃত্যমালিকা’য় নৃত্যাঞ্চলের সিনিয়র শিল্পীদের পাশাপাশি অংশ নেবেন ৩০০-এর অধিক শিল্পী। ফলে সমাপনী আয়োজনটি হয়ে উঠবে নৃত্যের নানা ধারা ও প্রজন্মের শিল্পীদের একসঙ্গে মঞ্চে আসার বিশেষ মুহূর্ত।
সমাপনী অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃত্যজুটি শামীম আরা নীপা ও শিবলী মোহাম্মদের বিশেষ নৃত্য পরিবেশনা। দীর্ঘ ২৫ বছরের শিল্পসাধনা ও নেতৃত্বে তারা নৃত্যাঞ্চলকে দেশের নৃত্যচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন নৃত্যধারার চর্চা ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছে একাধিক প্রজন্মের নৃত্যশিল্পী।
নৃত্যাঞ্চলের পথচলায় প্রশিক্ষণ, পরিবেশনা ও কর্মশালার পাশাপাশি বিভিন্ন নৃত্যধারাকে জানার ও শেখার সুযোগ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির আয়োজনে পশ্চিমা বেলে, কত্থক, ওডিশি, গৌড়ীয়, ছৌ, ব্রতচারী, লোক ও সৃজনশীল নৃত্যসহ বিভিন্ন ধারার কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। নৃত্যশিক্ষার এই বহুমাত্রিক প্রয়াসই নৃত্যাঞ্চলের দীর্ঘ শিল্পযাত্রাকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
রজতজয়ন্তী উপলক্ষে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনের লবিতে থাকছে নৃত্যাঞ্চলের ২৫ বছরের পথচলার বিশেষ প্রদর্শনী। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, পরিবেশনা, অর্জন ও স্মরণীয় মুহূর্তের আলোকচিত্র এবং বিভিন্ন স্মারক এতে প্রদর্শিত হবে। দর্শনার্থীরা এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ফিরে দেখতে পারবেন নৃত্যাঞ্চলের শিল্পসাধনার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো।
একটি নৃত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পচর্চার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে তৈরি করতে পারে, নৃত্যাঞ্চলের ২৫ বছরের যাত্রা তারই একটি উদাহরণ। এই দীর্ঘ পথচলায় মঞ্চে যেমন এসেছে অভিজ্ঞ শিল্পীদের পরিণত নৃত্যভাষা, তেমনি জায়গা পেয়েছে শিশু-কিশোরদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা।
তিন দিনের রজতজয়ন্তী উৎসবের মাধ্যমে তাই নৃত্যাঞ্চল শুধু অতীতের অর্জন উদ্যাপন করছে না, বরং নতুন প্রজন্মের হাতে নৃত্যের ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়ার প্রত্যয়ও প্রকাশ করছে। নৃত্য, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং প্রজন্মের মেলবন্ধনে শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে এই আয়োজন হয়ে উঠছে নৃত্যাঞ্চলের ২৫ বছরের শিল্পযাত্রার এক বর্ণাঢ্য উদ্যাপন।
তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের গণমাধ্যম সহযোগী মাছরাঙা টেলিভিশন এবং সহযোগিতায় রয়েছে শাহ সিমেন্ট।
সানা/ডিসি/১২/৯/২০২৬