সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতা জানানোর জন্য চালু করা ‘ঘুষ.সাইট’-এ প্রথম দুই দিনেই ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের মোট পরিমাণ ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
গত ২১ আগস্ট চালু হওয়া ওয়েবসাইটটিতে নাম-পরিচয় গোপন রেখে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন নাগরিকেরা। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য, বিচ্ছিন্নভাবে থাকা এসব অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এনে কোন সরকারি দপ্তর বা সেবা ঘিরে কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা।
ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে দুই বন্ধু এটি তৈরি করেছেন। তবে ওয়েবসাইটে জমা পড়া তথ্যকে যাচাই করা অভিযোগ বা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
যেভাবে কাজ করে ঘুষ সাইট: ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল-এই পাঁচ ধরনের তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অভিযোগ জানাতে কোনো হিসাব খোলার প্রয়োজন হয় না। পুরো প্রক্রিয়া দুই মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন করা যায়। তবে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করার সুযোগ নেই।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা নয়; কোন দপ্তর বা সরকারি সেবা ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, সেটিই তুলে ধরা এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
অভিযোগ জমা দেওয়ার পর তা সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরানো হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট বা নীতিমালা লঙ্ঘন করে-এমন অভিযোগও বাদ দেওয়া হয়। এরপর বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, চাওয়া অর্থের পরিমাণ ও ঘটনার ফলাফল অনুযায়ী অভিযোগ প্রকাশ করা হয়।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি অভিযোগ: উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দুই দিনে জমা পড়া ৮০৪টি অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৩০টি এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে। এরপর চট্টগ্রামে ১৬৭, রাজশাহীতে ৪৪, খুলনায় ৪৩, সিলেটে ৩৮, রংপুরে ৩৭, ময়মনসিংহে ৩০ এবং বরিশালে ১৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
অভিযোগকারীদের ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের সবকটি যে সত্য, এমন দাবি করছে না ঘুষ.সাইট। ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদনের সঙ্গে ‘অযাচাইকৃত’ হিসেবে উল্লেখ করা থাকে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, ঘুষ.সাইট কোনো অভিযোগকে সত্য ঘটনা কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে না। এটি কোনো তদন্ত সংস্থাও নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প হওয়ার দাবিও করছে না। মানুষের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এনে একটি উন্মুক্ত রেকর্ড তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য।
নিজস্ব অর্থে পরিচালিত হচ্ছে: উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত নিজেদের অর্থেই ওয়েবসাইটটি পরিচালিত হচ্ছে। কোনো বেসরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই এবং বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি। ওয়েবসাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগ রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের একজন সাইফ কবির বলেন, তাঁদের কাছে এই উদ্যোগের সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কত মানুষ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেন, তা নয়। কোনো নাগরিক সরকারি সেবা নিতে যাওয়ার আগে অন্যদের অভিজ্ঞতা দেখে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তা জানতে পারেন এবং অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন-এটিকেই তাঁরা উদ্যোগটির সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
সানা/আপ্র/২৪/৮/২০২৬