চার বছর আগে বিএনপির মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে স্বামীকে হারিয়েছিলেন নাসরিন আক্তার। এরপর একমাত্র ছেলে আবদুল্লাহ আল মাহীকে ঘিরেই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার সবটুকু আশা। কিন্তু সেই সন্তানকেও হারালেন তিনি। রোববার (২৩ আগস্ট) বিকেলে বাড়ির পাশের মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলার সময় অচেতন হয়ে মারা যায় দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহী।
নিহত আবদুল্লাহ আল মাহী পঞ্চগড়ের বোদা সরকারি পাইলট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিল। তার বাড়ি উপজেলার ময়দানদীঘি ইউনিয়নের পাথরাজ-চন্দনপাড়া এলাকায়।
স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানান, রোববার বিকেল ছয়টার দিকে বাড়ির পাশে পাথরাজ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিল মাহী। খেলার একপর্যায়ে সে অচেতন হয়ে পড়ে। পরে তাকে উদ্ধার করে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. জাহিদ হাসান বলেন, আবদুল্লাহ আল মাহী নামের ওই কিশোরকে রোববার বিকেলে মৃত অবস্থায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয়েছিল। স্বজনদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, ফুটবল খেলার সময় মাহী অচেতন হয়ে পড়েছিল।
সোমবার দুপুরে মাহীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ নীরবে চোখের পানি মুছছিলেন। উঠানে খাটিয়ায় রাখা ছিল মাহীর মরদেহ। আর ঘরের ভেতর শুয়ে বিলাপ করছিলেন তাঁর মা নাসরিন আক্তার। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
মাহীর চাচা আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “ছেলেটার মুখটা দেখে আমরা ওর বাবাকে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠেছি। আর আজকে ওকেই হারিয়ে ফেললাম। কী হবে এখন। এত শোক আমরা কীভাবে সহ্য করব? ওকে কোনো দিন বাবার অভাব বুঝতে দিইনি। স্বামীর পর সন্তান হারিয়ে ওর মায়ের পাগল হওয়া ছাড়া আর উপায় কী আছে।”
চার বছর আগে বাবাকে হারিয়েছিল মাহী: ২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলা শহরে বিএনপির গণমিছিল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় মারা যান মাহীর বাবা আবদুর রশিদ আরেফিন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫০ বছর। তিনি ময়দানদীঘি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
স্বজনেরা জানান, স্বামী মারা যাওয়ার মাত্র ৩০ দিন আগে নিজের বাবাকেও হারিয়েছিলেন নাসরিন আক্তার। বাবা ও স্বামী-দুজনকে হারানোর পর একমাত্র সন্তান মাহীই ছিল তাঁর একমাত্র অবলম্বন। ছেলেকে ঘিরেই তিনি নতুন করে জীবন সাজানোর চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু রোববারের মর্মান্তিক ঘটনায় সেই শেষ আশ্রয়টুকুও হারালেন তিনি। স্বজনেরা বলছেন, মাহীর মৃত্যুর পর নাসরিন প্রায় বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
ময়দানদীঘি ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাফিজুল ইসলাম বলেন, বাবার মৃত্যুর পর মাহী তার মায়ের একমাত্র আশা-ভরসা ছিল। খেলতে গিয়ে তার এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না। পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সোমবার বেলা আড়াইটায় পাথরাজ-চন্দনপাড়া এলাকায় মাহীর বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৪/৮/২০২৬