সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে সামনে রেখেই এগিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর মতে, জুলাই সনদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তাই বাহাত্তরের সংবিধান বহাল রেখেই সংশোধন ও সংস্কারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।
আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই সনদের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের ‘ক’ অংশে সংবিধান সংশোধন করে সংস্কারের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ফলে বাহাত্তরের সংবিধানকে সামনে রেখেই এগোতে হবে।
তিনি বলেন, ‘যারা বলছিলেন, বাহাত্তরের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সংস্কার করতে হবে, সেটা করলে আমি এক লাইনে যেতে পারতাম। কিন্তু আমার বাহাত্তরের সংবিধান যতক্ষণ আছে, এই সংবিধানকে আমার সংশোধন করতে হবে। সংশোধনের প্রক্রিয়ায় গিয়ে জুলাই সনদকে সামনে রাখতে হবে।’
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়ে প্রশ্ন: বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ওই আদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অধ্যাদেশের পরিবর্তে ‘আদেশ’ দেওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো কিছু যদি সংবিধান সংশোধনের সমপর্যায়ের হয়, তাহলে তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের কোনো অধ্যাদেশ জারি করা যায় না, যা সংবিধান সংশোধনের সমকক্ষ। এ কারণে তাঁরা অধ্যাদেশে না গিয়ে আদেশের পথে গেছেন।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য, ‘আইন পাস হবে সংসদে, যখন সংসদ থাকবে না তখন অধ্যাদেশ জারি হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ দিয়ে ‘বিভাজন তৈরির রাস্তা’ রেখে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক কর্মসূচির অধিকার: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের অভিযোগের প্রসঙ্গও আসে সংলাপে। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, দলের একজনের বিরুদ্ধে মামলা থাকায় তাঁদের সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না হলে তাদের কর্মসূচি পালনের অধিকার রয়েছে। সরকারের সমালোচনা করার অধিকারও তাদের রয়েছে এবং এই অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
সংবিধান সংস্কার কমিটি: এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী সংবিধান সংস্কার কমিটি নিয়েও কথা বলেন।
তিনি জানান, প্রথম অধিবেশনেই ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব ছিল। এতে বিএনপির সাতজন, বিরোধী জোটের পাঁচজন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাঁচজন থাকার কথা ছিল। বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দিতে বলা হলেও তাঁরা তা দেননি। পরে ১২ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল নাম দিলে সেগুলো নিয়ে সংবিধান সংস্কারের পথে এগোনো হবে। যৌক্তিক হলে তাঁদের যেকোনো বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের আইন: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়েও কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা ‘গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তখন তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল আইনের ভেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। ওই আইনে গুমের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সাধারণ আদালতে করার বিধান থাকলেও কোন মামলা কোন আদালতে হবে, তা সুনির্দিষ্ট ছিল না। সর্বোচ্চ সাজার কথা থাকলেও সর্বনিম্ন সাজার বিধান ছিল না। এসব বিচ্যুতি সংশোধনের জন্য আইনটি সংসদে তোলা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, জবাবদিহির জায়গা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। কোনো আইন কার্যকর প্রয়োগে সফল না হলে সংশোধনের জন্য সরকার উন্মুক্ত থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী তাঁর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান আইনমন্ত্রী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই সরকারের অন্যতম সহায়ক শক্তি ছিলেন। তাঁর পরামর্শ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দিকে এগোতে পারেনি-এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, জুলাইয়ের চেতনাধারী অনেক ব্যক্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছেন এবং জুলাইয়ের চেতনাও হারিয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের সংস্কারকে সবচেয়ে জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ জাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, তাঁরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেননি এবং গণভোটের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, সংবিধান সংশোধনের পর গণভোট হওয়া উচিত।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলী রিয়াজেরও সমালোচনা করেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি ও জ্বালানি সংকট: সংবাদমাধ্যম ‘চর্চা’র সম্পাদক সোহরাব হাসান দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এবং ইরান-সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়েও তিনি প্রশ্ন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটকে পূর্ববর্তী সরকারের ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের’ ফল বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, আমদানিনির্ভর নীতির পরিবর্তে আগের সরকার গ্যাসসহ দেশীয় জ্বালানি উত্তোলনে মনোযোগ দিলে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
সানা/আপ্র/২৪/৮/২০২৬