উপকূলীয় বাংলাদেশের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের প্রতি পাঁচজনের একজন আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে উপকূলের খাবার পানির উৎসে ব্যাপক লবণাক্ততার উপস্থিতিও পাওয়া গেছে গবেষণায়।
‘বাংলাদেশে খাবার পানির লবণাক্ততা এবং স্বাস্থ্য: প্রমাণ, অভিযোজন এবং নীতিগত সমাধান’ শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাসাকাওয়া মিলনায়তনে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন যৌথভাবে এ গবেষণা করছে।
গবেষণার বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ। গবেষণার আওতায় খুলনার কয়রা ও সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ৭১টি কমিউনিটি ক্লিনিকের আওতাধীন ১৭২টি গ্রামের খাবার পানির উৎস জরিপ করা হয়।
গবেষকেরা দুই উপজেলার ২৭ হাজার ৬৯৭টি পানির উৎস পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০৩টি বা ২৪ দশমিক ২ শতাংশ উৎস খাবার পানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। খাবার পানির উৎসগুলোর মধ্যে কয়রায় ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশে লবণাক্ততা পাওয়া গেছে।
গবেষণার অন্য অংশে দুই উপজেলার ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৫ হাজার ৪৭১ জন প্রাপ্তবয়স্কের হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। এতে দেখা যায়, ২১ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যক্তির আগামী ১০ বছরে মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার হৃদ্রোগ কিংবা স্ট্রোকের ঝুঁকি রয়েছে। কয়রায় এ হার ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আশাশুনিতে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে গবেষকেরা খাবার পানির লবণাক্ততা ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির মধ্যে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক দাবি করেননি। তাঁদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় খাবার পানিতে লবণাক্ততার উপস্থিতি এবং একই জনগোষ্ঠীর মধ্যে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের উচ্চ ঝুঁকি-দুটি বিষয়ই গবেষণায় উঠে এসেছে। পানিতে থাকা সোডিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষক আলিয়া নাহিদ জানান, ২০২৩ সালে এ গবেষণা শুরু হয়েছে এবং আগামী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তা শেষ হবে।
সেমিনারে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক পাওলো ভিইনিস বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততার জন্য এখনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যভিত্তিক সীমা নির্ধারিত হয়নি। পানিতে সোডিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদানের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে আরো গবেষণা করে উপযুক্ত স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
একই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান বাটলার বলেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলের পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দীর্ঘ সময় লবণাক্ত থাকতে পারে। তাই দুর্যোগের পর দ্রুত পানির উৎস পরিষ্কার ও পুনরুদ্ধার করা এবং উপকূলীয় বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী উঁচু করা জরুরি।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে তথ্যপ্রমাণ এখনো সীমিত। তবে আইসিডিডিআর,বির গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। উপকূলে স্বাস্থ্য সমস্যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
গবেষকেরা জানান, গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে কম লবণাক্ত খাবার পানির প্রাপ্যতা বাড়াতে সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুরের পানি ফিল্টার, টিউবওয়েল ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং খাবার পানির উৎসের ডিজিটাল নিবন্ধন ও নজরদারির উদ্যোগ রয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের স্ক্রিনিং, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের তাগিদ: সেমিনারে আলোচকেরা বলেন, উপকূলের লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা ও গবেষণা হলেও পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। এসব সমস্যাকে কখনো স্বাস্থ্য, কখনো পরিবেশ বা জলবায়ুর বিষয় হিসেবে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার পরিবর্তে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফাহমিদা খানম বলেন, খাবার পানির লবণাক্ততা একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়। এটি মোকাবিলায় পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পানি ও স্থানীয় সরকার খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগের বিস্তার বড় সমস্যা। এসব ঝুঁকি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সেমিনারে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদান জোরদার, খাবার পানিতে সোডিয়ামের স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা প্রণয়ন, পানির উৎসের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানির কার্যক্রমকে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সানা/আপ্র/২৪/৮/২০২৬