গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মেনু

বালু, লবণ ও ঘামে বদলে যাচ্ছে শক্তি সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০৯ পিএম, ২০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৭:১৫ এএম ২০২৬
বালু, লবণ ও ঘামে বদলে যাচ্ছে শক্তি সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ
ছবি

ফিনল্যান্ডের ছোট এক শহরে হাজার হাজার টন বালুতে তাপ ধরে রাখা হচ্ছে, যা দিয়ে স্থানীয় স্কুল, লাইব্রেরি ও টাউন হল উত্তপ্ত রাখা হয় -ছবি পোলার নাইট এনার্জি

জ্বালানি সংরক্ষণের প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি। এত দিন যেখানে শক্তি ধরে রাখার প্রধান ভরসা ছিল লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সেখানে এখন বিজ্ঞানীরা খুঁজে নিচ্ছেন আরো পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী বিকল্প। বালু, গলিত লবণ, তরল বাতাস এমনকি মানুষের শরীরের ঘাম-অবিশ্বাস্য মনে হলেও এসব উপাদান দিয়েই তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা।

বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদিত শক্তি সংরক্ষণ। সূর্য না থাকলে সৌরবিদ্যুৎ কিংবা বাতাস না থাকলে বায়ুবিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে প্রয়োজন দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখার কার্যকর প্রযুক্তি। এই চাহিদা থেকেই বিজ্ঞানীরা এগিয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন উদ্ভাবনের পথে।

লিথিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের মতো খনিজের ওপর নির্ভরশীল প্রচলিত ব্যাটারির পরিবেশগত ক্ষতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এসব খনিজ উত্তোলনে প্রকৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ফলে কম কার্বন নিঃসরণকারী, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তি সংরক্ষণ প্রযুক্তি এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।

তরল বাতাসে জমছে বিদ্যুৎ: যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের ট্রাফোর্ডে সাবেক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জায়গায় তৈরি হচ্ছে এক অভিনব শক্তি সংরক্ষণ প্রকল্প। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ‘হাইভিউ পাওয়ার’-এর তৈরি এ প্রকল্পে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকে তরল বাতাস হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।

প্রযুক্তিটি কাজ করে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার মাধ্যমে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে বাতাসকে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়। এ অবস্থায় বাতাস তরলে পরিণত হয়ে নিজের আয়তন প্রায় ৭০০ ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনে। পরে বিশাল ট্যাংকে সংরক্ষিত এই তরল বাতাস প্রয়োজনের সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনা হয়।

তরল বাতাস দ্রুত প্রসারিত হয়ে টারবাইন ঘোরায় এবং কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। চালু হলে প্রকল্পটি একটানা ছয় ঘণ্টা ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। এর মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা।

গলিত লবণে জমছে সূর্যের তাপ: তীব্র গরমকে শক্তি সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা মরুভূমির ‘ক্রেসেন্ট ডিউনস’ প্রকল্প। প্রায় ১০ হাজার আয়না দিয়ে সূর্যের তাপ সংগ্রহ করে পটাশিয়াম ও সোডিয়াম নাইট্রেটের মিশ্রণকে প্রায় ৫৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। এই উত্তপ্ত লবণ সূর্যাস্তের পরও প্রায় ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত তাপ ধরে রাখতে পারে। পরে সেই তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই প্রযুক্তি ‘গলিত লবণ সংরক্ষণ ব্যবস্থা’ নামে পরিচিত। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, ভারী শিল্পকারখানার কার্বন নিঃসরণ কমাতেও এ প্রযুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডেনমার্কে ইতোমধ্যে এক গিগাওয়াট-ঘণ্টা সক্ষমতার গলিত লবণ প্রকল্প চালু হয়েছে। সেখানে প্রায় ৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় লবণ উত্তপ্ত করে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত শক্তি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।

বালুর ব্যাটারিতে উষ্ণ হচ্ছে শহর: ফিনল্যান্ডের ছোট শহর পোরনাইনেনে বালু দিয়ে তৈরি হয়েছে এক অভিনব শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা। হাজার হাজার টন বালুর স্তূপে তাপ জমিয়ে রেখে তা ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় স্কুল, গ্রন্থাগার ও টাউন হল গরম রাখতে। এই ‘বালুর ব্যাটারি’তে প্রায় দুই হাজার টন গুঁড়া সাবানপাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এর সক্ষমতা এক মেগাওয়াট তাপীয় শক্তি এবং একশ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সংরক্ষণ।

প্রায় ১৩ মিটার উঁচু ও ১৫ মিটার চওড়া এই ব্যাটারি গ্রীষ্মকালে শহরের প্রায় এক মাস এবং শীতকালে প্রায় এক সপ্তাহের তাপের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এর ফলে ওই অঞ্চলে তেলের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ এবং কাঠের গুঁড়ার ব্যবহার প্রায় ৬০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে।

মানুষের ঘামেই তৈরি হবে বিদ্যুৎ: শক্তি সংরক্ষণের সবচেয়ে বিস্ময়কর গবেষণাগুলোর একটি চলছে জাপানে। টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের গবেষকেরা মানুষের ঘাম থেকে বিদ্যুৎ তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

গবেষকেরা এমন পাতলা পরিধানযোগ্য যন্ত্র তৈরি করছেন, যা মানুষের শরীরের ঘামে থাকা রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করতে পারে। এই প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘এনজাইমেটিক বায়োফুয়েল সেল’।

ঘামে থাকা ল্যাকটেট নামের উপাদান এনজাইমের মাধ্যমে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে ইলেকট্রনে রূপান্তরিত হয়। ফলে হাঁটা, ব্যায়াম কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময় শরীর থেকে বের হওয়া ঘাম থেকেই তৈরি হতে পারে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ।

ব্যাটারির নতুন যুগের সন্ধানে বিশ্ব: ভবিষ্যতের শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা হয়তো আর শুধু ধাতব ব্যাটারির ওপর নির্ভর করবে না। বালু, লবণ, বাতাস কিংবা মানুষের শরীর-প্রকৃতির নানা উপাদান থেকেই আসতে পারে নতুন শক্তির সমাধান।

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির এই নতুন দিগন্ত শুধু বিদ্যুৎ সংরক্ষণের সমস্যাই সমাধান করবে না, বরং বিশ্বকে আরো পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে পারে। শক্তির ভবিষ্যৎ হয়তো লুকিয়ে আছে এমন কিছু সাধারণ উপাদানে, যেগুলো এত দিন মানুষের চোখে ছিল একেবারেই সাধারণ।

সানা/কেএমএএ/আপ্র/২০/৭/২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

খালি চোখে অদৃশ্য ড্রোন বানালেন বিজ্ঞানীরা
১৯ জুলাই ২০২৬

খালি চোখে অদৃশ্য ড্রোন বানালেন বিজ্ঞানীরা

মানুষের চোখকে ফাঁকি দিয়ে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে-এমন অভিনব ড্রোন উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ‘ফ্যা...

কক্ষপথে পৌঁছেছে ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট
১৮ জুলাই ২০২৬

কক্ষপথে পৌঁছেছে ভারতের প্রথম বেসরকারি রকেট

মহাকাশ বাণিজ্যে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে ভারত। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠ...

পৃথিবীর মতো গ্রহে প্রথম মিলল বায়ুমণ্ডলের সন্ধান
১৮ জুলাই ২০২৬

পৃথিবীর মতো গ্রহে প্রথম মিলল বায়ুমণ্ডলের সন্ধান

মহাবিশ্বে ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানের গবেষণায় নতুন মাইলফলক তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমবারের মতো সৌরজ...

এআই প্রশিক্ষণে বাংলাদেশিদের অবদান, বাড়ছে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তির তাগিদ
১৫ জুলাই ২০২৬

এআই প্রশিক্ষণে বাংলাদেশিদের অবদান, বাড়ছে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তির তাগিদ

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে নীরবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বাংলাদে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই