গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

মাস্কের স্যাটেলাইটে ঠাসা কক্ষপথ, বাড়ছে সংঘর্ষের ঝুঁকি

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৫১ পিএম, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৬ এএম ২০২৬
মাস্কের স্যাটেলাইটে ঠাসা কক্ষপথ, বাড়ছে সংঘর্ষের ঝুঁকি
ছবি

বিভিন্ন স্যাটেলাইটের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষের ঘটনা এখনও বিরল হলেও ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যায় -ছবি রয়টার্স

পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ ক্রমেই স্যাটেলাইট ও মহাকাশ বর্জ্যে ঠাসা হয়ে উঠছে। এর সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইট। ফলে কক্ষপথে যানজট যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে স্যাটেলাইটের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কা। বিজ্ঞানীদের সতর্কতা, কোনো বড় সংঘর্ষ ঘটলে তার প্রভাব শুধু মহাকাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যোগাযোগ, নৌ-আকাশ পরিবহন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণসহ পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অবকাঠামোও বিপর্যস্ত হতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল বা ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত নিম্ন কক্ষপথে বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি বস্তু রয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজারের বেশি বস্তুর সঙ্গে স্পেসএক্সের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। মহাকাশে সবচেয়ে বড় কৃত্রিম উপগ্রহবহর পরিচালনা করছে স্পেসএক্স; এর স্টারলিংক সেবা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সরবরাহ করা হচ্ছে।

কক্ষপথে সংঘর্ষের ঘটনা এখনো বিরল। কিন্তু মহাকাশে বস্তুর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় ঝুঁকিও ক্রমশ জমা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একটি বড় সংঘর্ষের ফলে বিপুলসংখ্যক ধাতব খণ্ড ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব খণ্ড আবার অন্য স্যাটেলাইটে আঘাত করলে ধারাবাহিক সংঘর্ষের সৃষ্টি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিকে মহাকাশবিজ্ঞানীরা ‘কেসলার সিনড্রোম’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এতে নির্দিষ্ট কক্ষপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাকাশবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিউ লুইসের মতে, এমন পরিস্থিতির দিকে বিশ্ব এগোচ্ছে যেখানে কোনো সক্রিয় স্যাটেলাইট শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষের শিকার হতে পারে। সেটি সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা না করার কারণে নয়; বরং এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব চেষ্টা করার পরও কোনো একপর্যায়ে সংঘর্ষ ঠেকানো সম্ভব নাও হতে পারে।

সংঘর্ষ এড়াতে হাজার হাজারবার কক্ষপথ বদল: স্পেসএক্সের দাবি, তাদের স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো নিয়মিত নিজেদের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে এবং অন্য কোনো মহাকাশযান বা বর্জ্যের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কক্ষপথ পরিবর্তন করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো সংঘর্ষের ঝুঁকি এড়াতে ৩ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি কক্ষপথ পরিবর্তনের কৌশল নিয়েছে।

এই সংখ্যা মহাকাশে যানজটের মাত্রা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সংঘর্ষ এড়ানোর প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, অন্যদিকে কক্ষপথে সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা এত দ্রুত বাড়ছে যে প্রতিটি নতুন স্যাটেলাইটকে অসংখ্য সম্ভাব্য সংঘর্ষের হিসাবের মধ্যে পরিচালনা করতে হচ্ছে।

স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটগুলো সংঘর্ষের সম্ভাবনা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ পরিবর্তন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের নথিতেও স্পেসএক্সের অত্যন্ত কম সংঘর্ষ-ঝুঁকি সীমায় কক্ষপথ পরিবর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সংঘর্ষ এড়ানোর এই ব্যবস্থা যতই কার্যকর হোক, মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা যত বাড়বে, সম্ভাব্য সংঘর্ষের সংখ্যাও তত বাড়বে। বায়ুমণ্ডলে পুড়ে মহাকাশ বর্জ্য ধ্বংস হওয়ার চেয়ে নতুন স্যাটেলাইট ও অন্যান্য বস্তুর সংখ্যা দ্রুত বাড়লে কক্ষপথে বর্জ্যের ঘনত্ব আরো বাড়তে পারে।

শুধু দুর্ঘটনা নয়, ইচ্ছাকৃত ধ্বংসও ঝুঁকি: কক্ষপথে ঝুঁকি শুধু দুর্ঘটনাজনিত সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময় সামরিক শক্তিগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের স্যাটেলাইট ধ্বংসের পরীক্ষা চালিয়েছে। ২০০৭ সালে চীন ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি আবহাওয়া স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। ওই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মহাকাশ বর্জ্য তৈরি হয়।

২০২১ সালে রাশিয়াও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নিজেদের একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। ওই পরীক্ষায় ১ হাজার ৫০০টির বেশি শনাক্তযোগ্য বর্জ্যের টুকরা কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি মাত্র স্যাটেলাইট ধ্বংসের ঘটনাও দীর্ঘ সময়ের জন্য অন্য মহাকাশযানের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

তবে নিম্ন কক্ষপথে সর্বোচ্চ কতসংখ্যক স্যাটেলাইট নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব, তার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি। মহাকাশে জায়গার পরিমাণ বিপুল হলেও সব কক্ষপথ সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়। নির্দিষ্ট উচ্চতা ও কক্ষপথে স্যাটেলাইটের ঘনত্ব, তাদের গতি, গতিপথের পরিবর্তন এবং মহাকাশ বর্জ্যের উপস্থিতিই প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ করে।

স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান মিউয়ন স্পেসের প্রধান নির্বাহী জনি ডায়ারের মতে, ঝুঁকি শুধু স্যাটেলাইটের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। তাঁর মতে, পৃথিবীর আকাশসীমায় বিমানের তুলনায় মহাকাশে স্যাটেলাইট চলাচলের জন্য অনেক বেশি জায়গা রয়েছে। তবে কোনো পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে কি না কিংবা চরম অবহেলা করছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

আগামীতে আরো বাড়বে কক্ষপথের চাপ: মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরো দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎক্ষেপণের ব্যয় কমে আসা, ছোট আকারের স্যাটেলাইট তৈরি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে কক্ষপথে নতুন স্যাটেলাইট পাঠানো আগের চেয়ে সহজ হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মহাকাশভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের নতুন ধারণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতার প্রয়োজন মেটাতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর কক্ষপথে সৌরশক্তিচালিত তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে কক্ষপথে সর্বোচ্চ ১০ লাখ স্যাটেলাইট নিয়ে তথ্যকেন্দ্রের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। ব্লু অরিজিনও কক্ষপথে ৫১ হাজার ৬০০টি পর্যন্ত স্যাটেলাইট নিয়ে তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি চেয়েছে। তবে এসব আবেদনের সবগুলো যে বাস্তবে উৎক্ষেপণ ও স্থাপনে রূপ নেবে, তা নিশ্চিত নয়।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের মহাকাশ শুধু যোগাযোগ স্যাটেলাইটের জন্য নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটিং অবকাঠামোর জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে কক্ষপথ ব্যবস্থাপনা, সংঘর্ষ এড়ানো এবং মহাকাশ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ।

মহাকাশে যানজট এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে নিয়মিত সংঘর্ষ হচ্ছে। কিন্তু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নিরাপদ কক্ষপথ ব্যবস্থাপনা আরো কঠিন হয়ে উঠবে। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন শুধু কত স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো যাবে, তা নয়—কতটা দায়িত্বশীলভাবে সেই স্যাটেলাইটগুলো পরিচালনা করা যাবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৯/২০২৬ 
 

সংশ্লিষ্ট খবর

চাঁদের কক্ষপথে ‘ট্রাফিক জ্যাম’, আসছে নতুন নিয়ম
২৮ আগস্ট ২০২৬

চাঁদের কক্ষপথে ‘ট্রাফিক জ্যাম’, আসছে নতুন নিয়ম

চাঁদে মানুষের যাতায়াত বাড়ছে, ভবিষ্যতে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। ফলে পৃথিবীর...

ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজে নামবে রোবট-আরশোলা ‘প্যারাবর্গ’
২৮ আগস্ট ২০২৬

ভূমিকম্পে উদ্ধারকাজে নামবে রোবট-আরশোলা ‘প্যারাবর্গ’

ভূমিকম্প, ভবনধস কিংবা গুহায় দুর্ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষের কাছে পৌঁছা...

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিল গেটসের সতর্কবার্তা
২৮ আগস্ট ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিল গেটসের সতর্কবার্তা

কিছু চাকরি মানুষের জন্যই সংরক্ষিত চান

দুদিন পরেই বিরল চন্দ্রগ্রহণ, দেখা যাবে যেসব অঞ্চলে
২৬ আগস্ট ২০২৬

দুদিন পরেই বিরল চন্দ্রগ্রহণ, দেখা যাবে যেসব অঞ্চলে

আগামী ২৮ আগস্ট আকাশে সৃষ্টি হতে যাচ্ছে চলতি বছরের অন্যতম সেরা বৈচিত্র্যময় মহাজাগতিক মুহূর্ত। ওই দিন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ হলো মেসির মহাকাব্য

লিওনেল মেসি ঘোষণা দিয়েছেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন না। ৩৯ বছরের এই কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য হয়ে রইল গত জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে সেদিন আর্জেন্টিনার হাতে ওঠেনি বিশ্বকাপ। কিন্তু মেসির জন্য সেই হারই যেন তাঁর দুই দশকের আন্তর্জাতিক মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠা হয়ে থাকল। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন মেসি সঠিক সময়ে অবসর নিয়েছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 18 ঘন্টা আগে