বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। সোমবার (৩১ আগস্ট) কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনের ফাঁকে দুই নেতার বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গভীর করার পাশাপাশি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। খবর আল-জাজিরার।
মে মাসে পুতিনের চীন সফরের পর এই প্রথম মুখোমুখি বৈঠক করলেন দুই নেতা। বৈঠকের শুরুতে সি চিন পিং বলেন, পুতিনের সঙ্গে আবার দেখা হওয়ায় তিনি আনন্দিত। দুই দেশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে এবং সামনে এর আরো উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এই অগ্রগতি অব্যাহত রাখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা ও অনির্দেশ্যতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। তবে শান্তি, উন্নয়ন ও সহযোগিতার জন্য বিশ্বের মানুষের আকাঙ্ক্ষা অপরিবর্তিত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে চীন রাশিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার এবং আরো ন্যায্য ও সুশৃঙ্খল বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শক্তি জোরদার করতে প্রস্তুত।
পুতিনও দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে বলেন, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সফলভাবে এগিয়ে চলছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, দুই নেতার আলোচনায় মূল গুরুত্ব ছিল অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ এলেও তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের আবহ: পুতিন ও সির এই বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সম্পর্কের টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও গত কয়েক বছরে গভীর হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ইরানের তৈরি ড্রোন সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনকে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ না করার বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এ অবস্থায় রাশিয়া ও চীনের শীর্ষ নেতাদের প্রকাশ্যে সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প ভূরাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়ের বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরো বহুমেরুভিত্তিক করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
এসসিও সম্মেলনে পুতিন–মোদির বৈঠক: বিশকেকে দুই দিনের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে এক ডজনের বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এবারের সম্মেলনটি এই আঞ্চলিক জোটের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সম্মেলনের ফাঁকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মোদিও। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ভারতের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। পুতিনও বলেন, মস্কো সংকটের সমাধানের পথে এগোচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি আলোচনা এখনো কার্যত অচল হয়ে আছে।
পুতিনের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানেরও পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইরান ও রাশিয়া উভয়েই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশ এবং গত কয়েক বছরে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বেড়েছে।
এদিকে সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে পুতিন, সি চিন পিং, পেজেশকিয়ান, মোদি ও শাহবাজ শরিফসহ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর নেতারা অংশ নেবেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ।
পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প শক্তি হিসেবে এসসিও: সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় বর্তমানে ১০টি সদস্যদেশ রয়েছে। এর বাইরে তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতারসহ ১৫টি দেশ সংলাপের অংশীদার হিসেবে যুক্ত রয়েছে। আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়া জোটটির পর্যবেক্ষক দেশ।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জোট শুরুতে মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিলেও বর্তমানে অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও ভূরাজনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা বাড়ছে। চীন ও রাশিয়া জোটটিকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী।
তবে জোটের সদস্যদের স্বার্থ ও অবস্থান সব বিষয়ে এক নয়। ভারত ও চীনের মধ্যেও সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। একইভাবে রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়েও ভিন্নতা রয়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের বাইরে একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এসসিও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠছে।
এবারের সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে পুতিন ও সির বৈঠক শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় রাশিয়া ও চীনের কৌশলগত অবস্থান আরো ঘনিষ্ঠ করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৯/২০২৬