পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি ভারতকে অবশ্যই মেনে চলতে হবে বলে রায় দিয়েছে হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত। একই সঙ্গে ভারতকে কাশ্মির অঞ্চলে নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কিছু কাজ সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দেওয়া সিদ্ধান্তে সালিশি ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ভারত একতরফাভাবে চুক্তিটি স্থগিত করার কোনো বৈধ কারণ দেখাতে পারেনি। ফলে চুক্তিটি এখনো কার্যকর রয়েছে এবং এর অধীনে ভারতের যেসব বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলো মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে সিন্ধু নদের পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর নির্মিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও চুক্তির বিধান মানতে হবে।
১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির আওতায় সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার ভারত এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি ব্যবহারের অধিকার পাকিস্তান পায়। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে তিনটি যুদ্ধসহ বিভিন্ন সংঘাতের মধ্যেও টিকে ছিল। পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য চুক্তিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিজমি এর আওতাভুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল।
তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পহেলগামে একটি পর্যটনকেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ভারত ওই হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে। পাকিস্তান অবশ্য এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে। হামলার পরই ভারত সিন্ধু পানি চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।
এরপর ভারত কাশ্মির অঞ্চলের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে জলাধারের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু করে। পাকিস্তানের অভিযোগ, এসব পদক্ষেপ সিন্ধু পানি চুক্তির বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ নিয়ে ইসলামাবাদ সালিশি প্রক্রিয়ার দ্বারস্থ হয়। ভারত অবশ্য পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি এবং সালিশি আদালতের এখতিয়ারও অস্বীকার করে আসছে।
সোমবারের সিদ্ধান্তে স্থায়ী সালিশি আদালত স্পষ্ট করে বলেছে, চুক্তিটি কার্যকর রয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে তা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত চুক্তির কার্যকারিতা নষ্ট করেনি। আদালত আরো বলেছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর ওপর ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে চুক্তির বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।
তবে ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। নয়াদিল্লি এই সালিশি প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং রায়ও প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তথাকথিত সালিশি আদালতের ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো এখতিয়ার নেই। তাদের নেওয়া প্রকল্পসংক্রান্ত পদক্ষেপের ওপর এই রায়ের কোনো প্রভাব পড়বে না বলেও জানানো হয়েছে।
রাতল প্রকল্পে কাজ সীমিত: সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে মূল সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কাশ্মিরের রাতল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছে সালিশি ট্রাইব্যুনাল।
পাকিস্তানের একটি দাবির সঙ্গে একমত হয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, বিশ্বব্যাংকের নিয়োগ করা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত রাতল প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও পানি প্রবেশের কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশে কাজ সীমিত রাখতে হবে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞকে ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ সিন্ধু পানি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্তের পরও ৯০ দিন পর্যন্ত নির্দিষ্ট নির্মাণকাজে বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে বিরোধের নিষ্পত্তিতে স্থায়ী সালিশি আদালত ও বিশ্বব্যাংক-নিযুক্ত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ—দুটি পৃথক প্রক্রিয়া চলছে। ২০২৫ সালেও সালিশি আদালত চুক্তির ব্যাখ্যা ও ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা নিয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।
নতুন এই রায়ে একদিকে সিন্ধু পানি চুক্তির কার্যকারিতা বহাল থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে কাশ্মিরের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে ভারত-পাকিস্তান বিরোধও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারত রায় প্রত্যাখ্যান করায় এর বাস্তব প্রয়োগ এবং দুই দেশের পানি-সম্পর্ক ভবিষ্যতে কী দিকে যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৯/২০২৬