কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে বহু চাকরি স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে কিছু পেশা শুধু মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের সরকারগুলো এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয় বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
‘দ্য টার্বুলেন্ট এআই এরা ইজ হিয়ার: দ্য চয়েসেস উই মেক আর ক্রিটিক্যাল’ শিরোনামে প্রায় ছয় হাজার শব্দের এক দীর্ঘ নিবন্ধে গেটস তাঁর এই অবস্থান তুলে ধরেন। গত তিন বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এটিই তাঁর প্রথম বিস্তারিত নিবন্ধ।
গেটস লিখেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট যতই উন্নত হোক না কেন, কিছু কাজ মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট করে রাখা উচিত। তিনি এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রকে ‘মানুষের জন্য সংরক্ষিত’ ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় যেভাবে বন ও প্রকৃতির জন্য অভয়ারণ্য রাখা হয়, তাঁর প্রস্তাবিত ধারণাটিকেও তিনি তার সঙ্গে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ কোনো কাজ প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব হলেও, মানুষের অস্তিত্ব, মর্যাদা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্পর্কের মূল্য বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে মানুষকেই দায়িত্বে রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
এর উদাহরণ হিসেবে নিজের বাবার কথা উল্লেখ করেছেন গেটস। ছয় বছর আগে আলঝেইমার্স রোগে আক্রান্ত বাবার পরিচর্যায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁদের যত্ন ও আন্তরিকতার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব। কোনো গুরুতর বা নিরাময়-অযোগ্য রোগের খবর রোগীকে একটি রোবট জানাতে পারলেও নৈতিকভাবে সেটি মানুষের দায়িত্ব হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।
গেটসের ধারণা অনুযায়ী, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের পরিচর্যা, শিক্ষা, মানসিক সহায়তা ও এমন সব পেশা, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সহমর্মিতা ও আস্থার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোতে মানুষের ভূমিকা সংরক্ষণ নিয়ে ভাবা দরকার। তবে কোন কোন কাজ স্থায়ীভাবে মানুষের জন্য রাখা হবে, তা দেশ ও সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
সরকারগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তৃত প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিকাঠামো তৈরিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গেটস। তাঁর মতে, এ প্রযুক্তির প্রভাব শুধু কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় নিরাপত্তা, শিক্ষা, করব্যবস্থা, জ্বালানি, নির্বাচন, বায়ু ও পানি, জনস্বাস্থ্য, আর্থিক ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ, পরিবহন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে।
তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন কাঠামো তৈরি ও তা কার্যকর করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিশ্বের সরকারগুলোর আছে কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার সামলাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে বলেও মনে করেন গেটস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী নভেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর একটি বৈঠকের আয়োজনের চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
চাকরি ও করব্যবস্থা নিয়েও নতুন ভাবনা
গেটস মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যেসব কর্মী চাকরি হারাবেন, তাঁদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্রকে প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহারের আর্থিক প্রণোদনা কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও রোবটের ওপর কর আরোপের মতো নীতিও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
তাঁর আশঙ্কা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন একদিকে উৎপাদনশীলতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অভাবনীয় সুযোগ তৈরি করবে, অন্যদিকে প্রস্তুতি ছাড়া এই পরিবর্তন ঘটলে বেকারত্ব, আয়বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বিমুখী প্রভাব
শিক্ষাক্ষেত্র নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গেটস। তাঁর মতে, যে প্রযুক্তি মানুষকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে, অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সেটিই আবার মানুষকে কম শেখার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি একটি প্রাথমিক জরিপের কথা উল্লেখ করে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাশক্তি কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে এবং তরুণদের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরো স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিতর্কের পর এটি গেটসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য বক্তব্য। গেটসের বিরুদ্ধে এপস্টেইনের অপরাধে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ নেই। তবে গেটস ফাউন্ডেশনের পর্যালোচনায় ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা ও কর্মীদের সঙ্গে এপস্টেইনের প্রায় ৩০টি বৈঠকের তথ্য উঠে এসেছে, যার কয়েকটিতে গেটসও উপস্থিত ছিলেন। গেটস পরে এপস্টেইনের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছেন।
গেটসের মূল সতর্কবার্তা হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়; বরং পরিবর্তনের গতি, এর সুফল এবং মানুষের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতি—সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে এখনই নীতিগত প্রস্তুতি নিতে হবে।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬