ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্য ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলের সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদ, হইচই ও হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট কার্যত অচল হয়ে পড়ে সংসদের কার্যক্রম। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা জানালেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বারবার চেষ্টা করেও হট্টগোল থামাতে না পেরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেলে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ ঘটনা ঘটে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের একটি সম্পূরক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। তিনি দেশে দিনদুপুরে ছিনতাই, সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ঘিরে ভুয়া স্লোগান এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নের প্রথম এক মিনিট তিনি অমনোযোগী ছিলেন। পরে শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রশ্নটি পুনরায় করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পরই বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন। অনেকে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান এবং হইচই করতে থাকেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি কাউকে উদ্দেশ করে কথাটি বলেননি। কিন্তু প্রতিবাদ অব্যাহত থাকলে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার শেল্টার চাই।’
এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।’ ওই সময় কয়েকজন সদস্য আপত্তি জানালেও শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাবে ‘শাহবাগ’ প্রসঙ্গ আসার পর পরিস্থিতি তীব্র রূপ নেয়।
বিরোধী দলের হইচইয়ের মধ্যে একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা জানান। এরপরও প্রতিবাদ থামেনি। একপর্যায়ে কথা বলতে না পেরে তিনি আসনে বসে পড়েন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার বিরোধী দলের সদস্যদের আসনে বসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, সদস্যদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে; তবে নিয়ম মেনে মাইক্রোফোনে বক্তব্য দিতে হবে।
স্পিকার বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছেমতো সরকারকে সমালোচনা করতে পারছেন।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তাঁদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না হলে সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
‘উনি নিজেকে কী মনে করেন’
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন স্পিকার। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি বলেন, তাঁকে আগে সুযোগ দিলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়টি শুনতে পারতেন।
সরকারি দলের কয়েকজন সদস্যের মন্তব্যের প্রতিবাদ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘বক্তব্য কি আপনি দেবেন, না আমি দেব? আপনি দেন।’
তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্যের সময় এভাবে মন্তব্য করা অশোভন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখেই তিনি বলেন, সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের সদস্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে ‘শিক্ষকের ভূমিকা’ পালন করবেন—এমন বক্তব্য দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁর ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে সংসদীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এ ধরনের আচরণ ‘সংসদীয় ফ্যাসিজম’। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ এবং তাঁর বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। তা না হলে অপমান নিয়ে সংসদে বসার প্রশ্নই ওঠে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধী দলের সদস্যরা এ সময় টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।
‘সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত’
পরে স্পিকার বলেন, জাতীয় সংসদে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সবাইকে কাজ করতে হবে। কার্যপ্রণালি বিধি অনুসরণ না করলে সংসদ কার্যকর থাকে না।
তিনি বলেন, ‘আমি গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, ক্রমেই কিছু কিছু সদস্যের মধ্যে আমি অসহিষ্ণুতা লক্ষ করছি। জাতীয় সংসদ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এখানে প্রত্যেকেরই কথা বলার স্বাধীনতা আছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পরীক্ষা করে অসংসদীয় কিছু থাকলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে স্পিকার বলেন, কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা যাবে না। তিনি সদস্যদের সংসদ পরিচালনায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা পরে বলেন, সংসদকে কোনো পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ভাগ করার পক্ষে তাঁরা নন। ভালো কাজে সবাই একসঙ্গে থাকবেন এবং অন্যায় হলে প্রতিবাদ করবেন—এমন অবস্থানের কথাও জানান তিনি।
এরপর সরকারি দলের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী কার্যপ্রণালির বিধির আওতায় বক্তব্য দেন।
তাঁর বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। আজকে যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করেছি, এটি সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়।’
তিনি আরো বলেন, অনেক কষ্টের পর দেশে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সংসদের প্রত্যেক সদস্যের। তাই পারস্পরিক সহনশীলতা, সংসদীয় শিষ্টাচার ও নিয়ম মেনে বক্তব্য দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬