জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তাঁর মন্তব্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মনে রাখা উচিত—‘শাহবাগই’ তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আজকেও উনি এ রকম কথাই বলেছেন যে এগুলো পল্টন না, এটা শাহবাগ না। এটা ওনার মনে রাখা উচিত ছিল, আজকে যে উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এটা শাহবাগের প্রোডাক্ট। শাহবাগই ওনাকে আজকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময় নানা মন্তব্যের মাধ্যমে বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্য উপেক্ষা করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেন জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে তাঁরা অনেক মন্তব্য করতে পারেন। তবে একটি ‘সভ্য ও সংস্কৃতিবান সংসদ’ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাঁরা সমালোচনার ক্ষেত্রে সংযত থাকছেন।
তাহের বলেন, তাঁদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমিরসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের বিষয়ে সতর্ক থাকেন, যাতে সংসদের মর্যাদা কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়।
উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ
বিএনপি সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে যে আচরণ করছে, অতীতে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের সঙ্গে এমন আচরণ করেনি বলেও অভিযোগ করেন তাহের। তাঁর দাবি, সরকারের উন্নয়ন তহবিলের বরাদ্দ বিএনপি তাদের দলীয় লোকজনকে দিচ্ছে, অথচ বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরাও লাখ লাখ ভোট পেয়ে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। যে আন্দোলনের মূল কথা ছিল বৈষম্যবিরোধিতা, বিএনপি এখন সেই বৈষম্যের ক্ষেত্রেই ‘চ্যাম্পিয়ন’ হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদেরও বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন জামায়াতের এই নায়েবে আমির।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ক্ষোভ
দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাহের। তিনি বলেন, দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ, তেল, সার ও বীজের সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেউ বলতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, এ পরিস্থিতিতে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে জরুরি সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কোনো অধিবেশন ডাকেনি। পরে হঠাৎ ২৭ আগস্ট সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়। বিরোধী দল আশা করেছিল, তাদের দেওয়া চিঠির বিষয়টি অধিবেশনে আলোচনা হবে; কিন্তু সেটি কার্যত আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একই ধরনের আদেশের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে দাবি করে তাহের বলেন, বিএনপি এখন গণভোটকে সংবিধানের আওতাভুক্ত নয় বলছে। তাঁর যুক্তি, গণভোট যদি সংবিধানের আওতাভুক্ত না হয়, তাহলে একইভাবে নির্বাচন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকারও বৈধতার প্রশ্নের বাইরে থাকতে পারে না।
বিরোধী দল গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, বিরোধী দলের লংমার্চের উদ্দেশ্য জনগণকে জানানো যে বিএনপি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে এবং একই আইনের দুই ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
দুর্নীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা
প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’র কথা বললেও বাস্তবে দুর্নীতি বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তাহের। তিনি বলেন, ‘আজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। এখন আমরা দেখছি জিরোটা আছে; কিন্তু তার বাঁয়ে আরো ১০০ যোগ হয়ে গেছে। তাইলে কত হয়? ১০০০ হয়। সেই হারেই দুর্নীতি চলছে।’
চাঁদাবাজিও প্রধানমন্ত্রীর জানার বাইরে থাকার কথা নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে দুর্নীতি আরো বেড়ে চলেছে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার নিজেদের মতো করে বিল পাস করছে বলেও অভিযোগ করেন তাহের। জনগণের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অংশীদার হতে তাঁরা চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থে তাঁরা এসব বিলের আলোচনা, শুনানি বা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ না নিয়ে বর্জন করছেন।
তিন বিল নিয়ে নাহিদ ইসলামের অভিযোগ
এদিকে বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সংসদে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তিনি কটূক্তি করেছেন। এ ক্ষেত্রে স্পিকার পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, স্পিকারের আচরণে বিরোধী দলকে অসহিষ্ণু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলসহ তিনটি বিল সংসদে উত্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। বিরোধীদলীয় নেতা বিলগুলো বিচ্ছিন্নভাবে না এনে একসঙ্গে আনার প্রস্তাব দিলেও সরকার সেগুলো আলাদাভাবে নিজেদের মতো করে উত্থাপন ও পাস করিয়ে নিচ্ছে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সরকারের সংসদীয় স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা প্রকাশ পাচ্ছে। তাঁর দাবি, স্পিকার ও সরকারি দল এককভাবে সংসদের পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
মক্কা চুক্তি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘মক্কা যে চুক্তি করেছে অ্যাপারেন্টলি আমরা মনে করি এটা একটা পজিটিভ।’
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬