নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। গত বুধবার হিমালয়সংলগ্ন নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর পাহাড়ি নদীগুলোতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদামাটি নেমে এসে এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলার মধ্যেই নতুন করে আরেক দফা ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাবে, দেশটিতে বন্যায় নিহতের সংখ্যা ৪৬৯। তবে চীনের তিব্বত অংশেও অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার হিসাব আলাদা হলেও এক হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের হিসাবে প্রায় ৯১০ জন এবং তিব্বতের গিরং এলাকায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় গাইড রয়েছেন।
হিমবাহ ধস থেকে ভয়াবহ বন্যা
গত ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় আকস্মিক এই বন্যা আঘাত হানে। প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও উপগ্রহচিত্রের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, হিমবাহের একটি অংশ ধসে পড়া এবং তার সঙ্গে বরফ, পাথর ও মাটি নদীপথে জমে গিয়ে সাময়িক একটি জলাধার তৈরি হওয়ার পর সেটি ভেঙে বিপুল জলরাশি নিচের দিকে নেমে আসে।
প্রথমে ঢলটি লহেন্দে খোলা নদীতে প্রবেশ করে। পরে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে আরও নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানি প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নদীর স্রোত এতটাই প্রবল ছিল যে, পাহাড়ি জনপদ, ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে ভেসে যায়।
নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংসহ বিভিন্ন এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে নদীর স্রোত ও ভেসে যাওয়া মরদেহ আরও দক্ষিণের গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসি এলাকাতেও পৌঁছেছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং অন্তত ১৯টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নতুন হ্রদে বাড়ছে বিপদের আশঙ্কা
পুরোনো বিপর্যয়ের ধ্বংসস্তূপ এখন নতুন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে নদীর গতিপথ পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষে আটকে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য এবং উপগ্রহচিত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে হ্রদটির অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। হ্রদটির পানি ক্রমেই বাড়ছে এবং এটি যেকোনো সময় ভেঙে গিয়ে ভাটির দিকে ভয়াবহ ঢল নামাতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের কাছে তৈরি হ্রদটিতে ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছে। আগামী কয়েক দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে প্রবেশ করতে পারে। ফলে হ্রদটির বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভোতে কোশি নদীর ভাটির বাসিন্দা, উদ্ধারকর্মী, পর্যটক ও পথচারীদের নদীর তীর এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ স্থানে সরে যেতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলেছে নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ধ্বংসস্তূপে চলছে মরিয়া উদ্ধার অভিযান
বন্যার পর থেকে নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে জীবিতদের উদ্ধার, খাদ্য ও জরুরি সামগ্রী সরবরাহ এবং বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধানে ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করা হচ্ছে।
নেপালের সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ গিরং বন্দরও বন্যার প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দরটির সঙ্গে চীনের তিব্বত ও দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ যুক্ত থাকায় এর ক্ষতি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় গিয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করেছেন।
ছবি রয়টার্স
নিখোঁজদের মধ্যে বহু বিদেশি নাগরিক থাকায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রী তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর এলাকায় যাওয়ার পথে এই দুর্যোগের কবলে পড়েছিলেন। ফলে স্বজনদের উদ্বেগও ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে উদ্ধারকাজ যখন এখনো শেষ হয়নি, তখন নতুন হ্রদ ভেঙে আরেক দফা ভয়াবহ ঢল নামার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান ও ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, অন্যদিকে নতুন বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা—দুই দিকেই একসঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে নেপাল ও চীনের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬