কক্সবাজার শহরের ঝাউতলা এলাকার একটি হোটেলের বারে দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুই যুবক নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে রেনেসাঁ হোটেলের দোতলায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রথমে নাজিবুল হক রাশেদ নামের এক যুবক নিহত হন। পরে তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত সোলাইমান ওরফে সালমানও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
নিহত রাশেদ কক্সবাজার শহরের মধ্যম নুনিয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বয়স ২৮ বছর বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অপর নিহত সোলাইমান ওরফে সালমান বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বয়স ২৬ বছর বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে রেনেসাঁ হোটেলের বারে কয়েকজন যুবক বসে ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই পক্ষ বাইরে থেকে আরো লোকজন ডেকে আনে। এরপর দেশীয় অস্ত্র, ছুরি ও ভাঙা কাচের বোতল নিয়ে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে রাশেদ গুরুতর আহত হন। তাঁর গলা ও পেটে ধারালো ও ভাঙা কাচের আঘাত লাগে বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রাশেদ নিহত হওয়ার পর তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় সালমানকে স্থানীয় লোকজন আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। গুরুতর আহত সালমানকে পুলিশ পাহারায় প্রথমে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
সালমানের মৃত্যুর বিষয়ে স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, রাশেদের মৃত্যুর পর তাঁর পক্ষের লোকজন সালমানকে হাসপাতাল বা আশপাশের এলাকা থেকে তুলে নিয়ে মারধর করে। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশও সালমানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তদন্তের আগে কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য দেয়নি। তাঁর মৃত্যুর কারণ ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
বারটি নিয়ে পুলিশের বক্তব্য
ঘটনার পর রেনেসাঁ হোটেলের বারটি বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে বারটি অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার আলামত সংরক্ষণ ও তদন্তের স্বার্থে বারটি সিলগালা করা হয়েছে।
তবে রেনেসাঁ হোটেলের ব্যবস্থাপক ফয়েজুল হক পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাঁর দাবি, তাঁদের বারের অনুমোদনের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত রয়েছে।
ফলে বারের বৈধ অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাইয়ের পরই প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, নিহত দুই যুবকের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর ঝাউতলা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সংঘর্ষে কারা অংশ নিয়েছিল, কারা অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং রাশেদ ও সালমানের মৃত্যুর পেছনে কার কী ভূমিকা ছিল—এসব শনাক্ত করতে ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ঘটনার পরপরই এক যুবক নিহত এবং আরেকজনকে আটক করার তথ্য পাওয়া গেলেও পরে সালমানের মৃত্যুর কারণে নিহতের সংখ্যা দুইয়ে দাঁড়ায়। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে; মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
একই ঘটনায় দুই তরুণের মৃত্যু ঘিরে ঝাউতলা এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, এতে কতজন জড়িত এবং দ্বিতীয় যুবকের মৃত্যুর পেছনে কোনো পাল্টা হামলা বা গণপিটুনির ঘটনা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন পুলিশের তদন্তেই নির্ভর করছে।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬