চাঁদপুর শহরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কয়েক দিন ধরে তৈরি হওয়া রহস্যের অবসান হয়েছে। সপরিবারে আত্মগোপনে থাকা পিন্টু দাসকে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ভোরে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে আটক করেছে চাঁদপুর সদর মডেল থানা পুলিশ। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী রিমি দাস ও দুই সন্তানও ছিলেন। পরে তাঁদের চাঁদপুরে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চাঁদপুরের কুমিল্লা রোডের আখন্দ মার্কেটে ‘এস কে জুয়েলার্স অ্যান্ড শিল্পালয়’-এর স্বত্বাধিকারী পিন্টু দাসকে ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে শহরে নানা আলোচনা চলছিল। ১৯ আগস্ট রাত থেকে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। একই সময় তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শহরের কালীবাড়ি মন্দিরসংলগ্ন ভাড়া বাসাও তালাবদ্ধ দেখা যায়। স্ত্রী ও দুই সন্তানের সঙ্গেও স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে।
তবে পুলিশের অনুসন্ধানে পরে বেরিয়ে আসে, পিন্টু দাস সপরিবারে আত্মগোপনে গেছেন। চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁকে পালিয়ে যেতে সহায়তাকারী এক ট্রাকচালকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়। শুক্রবার ভোরে পটিয়ার দলঘাট দাসপাড়ার নিজবাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে পরিবারের সদস্যদেরসহ আটক করা হয়।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক কালাম গাজী জানান, পিন্টু দাসের ভাড়া বাড়ির মালিক রাসেল খান ২২ আগস্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর পুলিশ চাঁদপুর ও কুমিল্লায় পিন্টুর স্বজন ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে খোঁজ নেয়। দুই দিন ধরে অনুসন্ধানের পর তাঁর অবস্থান চট্টগ্রামের পটিয়ায় শনাক্ত করা হয়। শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে সেখানে অভিযান চালিয়ে তাঁকে পরিবারের সদস্যদেরসহ আটক করা হয়।
বন্ধকি স্বর্ণ ও টাকার লেনদেন নিয়ে অভিযোগ
পিন্টু দাসকে ঘিরে রহস্যের কেন্দ্রে এখন উঠে এসেছে বন্ধকি স্বর্ণ ও বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন। স্থানীয় কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও গ্রাহকের অভিযোগ, পিন্টু দাস বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা দেওয়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে পাওনা টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণালংকার নিতে গেলে অনেকেই তা ফেরত পাচ্ছিলেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সমিতি থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়ার কারণেও তিনি আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান এর আগে জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পিন্টু দাস বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ঋণের চাপ থেকে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন কি না, সেটিকে তখনো পুলিশের প্রাথমিক ধারণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিখোঁজ বা আত্মগোপনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও পুলিশ জানিয়েছিল।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একজনের দাবি, পিন্টুর কাছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকার স্বর্ণ বিক্রির জন্য দেওয়া হয়েছিল। পরে ওই অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় তাঁর স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ছয় লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং ২০ আগস্ট টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ১৯ আগস্ট রাতে পিন্টু পরিবার নিয়ে চাঁদপুর ছাড়েন বলে অভিযোগ।
আরেকজনের দাবি, তিনি পিন্টুর কাছে আড়াই ভরি স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে টাকা ফেরত দিয়ে স্বর্ণালংকার নিতে গেলে তাঁকে পরদিন আসতে বলা হয়। এর পরই পিন্টু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার খবর পান তিনি। আরো কয়েকজন ১২ আনা ও ১০ আনা স্বর্ণ বন্ধক রাখার দাবি করেছেন। এসব অভিযোগের কোনোটিই এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
ছয় লাখ টাকার চেক নিয়ে অভিযোগ
পিন্টুর কাছে টাকা পাওনা থাকার দাবিও করেছেন চাঁদপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ী। ইচলি এলাকার আবুল বারাকাত পাটওয়ারীর দাবি, সোনার গহনা তৈরির লেনদেন বাবদ তাঁর ছয় লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। পিন্টু তাঁকে তিনটি চেক দিয়েছিলেন। ব্যাংকে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, চেকের বিপরীতে হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা নেই। এ ঘটনায় মামলা করার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
চাঁদপুর জেলা শাখা বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মানিক পোদ্দারও জানিয়েছেন, পিন্টুর সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ক্রেতার লেনদেন ছিল। এক ব্যবসায়ীর পাওনা এক ভরি দুই আনা স্বর্ণের মধ্যে আট আনা উদ্ধার করা হয়েছিল; আরো ১০ আনা পাওনা রয়েছে বলে তাঁর ভাষ্য।
কয়েক মাসেই নতুন দোকান
পিন্টু দাস দীর্ঘদিন ধরে চাঁদপুরে স্বর্ণের ব্যবসা করছিলেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আখন্দ মার্কেটে পাঁচ-ছয় মাস আগে তিনি নতুন দোকান দেন। এর আগে জোরপুকুরপাড় এলাকায় পাঁচ-ছয় বছর এবং নিউমার্কেটে প্রায় তিন বছর স্বর্ণের ব্যবসা করেন।
শহরের কালীবাড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী রিমি দাস ও দুই ছেলে প্রিয়ম ও রুপমকে নিয়ে থাকতেন তিনি। পরিবারটি সেখানে কয়েক মাস ধরে বসবাস করছিল। ১৯ আগস্টের পর বাসা ও দোকান দুটিই বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাড়ির মালিকের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
তবে পিন্টু দাসের স্বজনদের পক্ষ থেকে তাঁর আত্মগোপনের কারণ নিয়ে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর এক নিকটাত্মীয় জানিয়েছিলেন, পিন্টুর ওপর ঋণের চাপ ছিল এবং তাঁকে হুমকি দেওয়ার কথাও তাঁরা শুনেছিলেন। ফলে তিনি পরিবার নিয়ে কোথাও চলে গেছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরাও নিশ্চিত ছিলেন না।
এখনো মামলা হয়নি
পুলিশের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, পিন্টু দাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি। চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, কোনো পাওনাদার মামলা করলে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলে পিন্টু দাসের সপরিবারে আত্মগোপনের পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, কত মানুষের স্বর্ণ বা টাকা তাঁর কাছে পাওনা রয়েছে এবং এসব অভিযোগের সত্যতা কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী তদন্তেই পরিষ্কার হওয়ার কথা।
পুলিশের হাতে সপরিবারে ফিরে আসায় ‘নিখোঁজ’ রহস্যের আপাত অবসান হলেও মূল রহস্য এখনো কাটেনি। বরং সামনে এসেছে নতুন প্রশ্ন—কতটা আর্থিক চাপের মুখে পড়ে পিন্টু দাস পরিবার নিয়ে চাঁদপুর ছাড়লেন এবং তাঁর কাছে থাকা বন্ধকি স্বর্ণ ও পাওনা অর্থের প্রকৃত পরিমাণ কত? তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
সানা/আপ্র/২৮/৮/২০২৬