বিশ্বকাপের মহারণে প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার যেন বড় ফারাক দেখা গেল। শিরোপার লড়াইয়ে মাঠে নামা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা পুরো ৯০ মিনিটে স্পেনের সামনে ছিল অনেকটাই নিষ্প্রভ ও বিবর্ণ। বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের ধার, পাসিং ফুটবল—সব দিক থেকেই স্পেন এগিয়ে থাকলেও গোলের দেখা পায়নি কোনো দল। ফলে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে।
শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় স্পেন। তাদের পরিচিত পাসনির্ভর ফুটবল, মাঝমাঠের দখল এবং দ্রুত আক্রমণ তৈরির কৌশলে বারবার চাপে পড়ে আর্জেন্টিনা। বিপরীতে লিওনেল মেসির দলকে দেখা গেছে মূলত রক্ষণ সামলাতে এবং প্রতি-আক্রমণের অপেক্ষায় থাকতে।
প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের গোলমুখে কার্যকর কোনো আক্রমণই তৈরি করতে পারেনি। এমনকি প্রথম ৪৫ মিনিটে কোনো শটও নিতে পারেনি তারা। স্পেন বলের দখলে প্রায় ৬৫ শতাংশ আধিপত্য ধরে রেখে আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধেই ব্যস্ত রাখে।
ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। পঞ্চম মিনিটে লামিন ইয়ামাল বিপজ্জনক অবস্থানে বল পেলেও আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ দুর্দান্ত দক্ষতায় তার প্রচেষ্টা রুখে দেন। এরপরও স্পেন একাধিকবার আক্রমণে উঠলেও শেষ মুহূর্তের ব্যর্থতায় গোল আদায় করতে পারেনি।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা লিওনেল মেসিকে পুরো ম্যাচেই অনেকটা বিচ্ছিন্ন দেখা গেছে। স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ ও মাঝমাঠের চাপের কারণে মেসি স্বাভাবিকভাবে খেলায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। বিশ্বমিডিয়ার বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, স্পেনের নিয়ন্ত্রিত ফুটবল আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে কার্যত আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে স্পেনের আধিপত্যের মাঝেও গোলরক্ষক মার্তিনেজ ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। ৩৯তম মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালের নিশ্চিত গোলের মতো সুযোগও দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন তিনি।
৪১তম মিনিটে মিকেল ওইয়ারসাবালকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। পরে চোটের কারণে তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। তার জায়গায় অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দিকে নামান কোচ লিওনেল স্কালোনি।
দ্বিতীয়ার্ধেও চিত্র খুব বেশি বদলায়নি। স্পেন বলের দখল রেখে আক্রমণের চেষ্টা চালিয়ে যায়। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা অপেক্ষা করতে থাকে মেসি, আলভারেজ কিংবা আক্রমণভাগের কোনো মুহূর্তের জাদুর জন্য। কিন্তু নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি করতে পারেনি তারা।
পরিসংখ্যানও স্পেনের আধিপত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। স্পেনের পাসের সংখ্যা ছিল আর্জেন্টিনার প্রায় দ্বিগুণ। প্রতিপক্ষের সীমানায় প্রবেশ, বল নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণের ধার—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল ইউরোপের চ্যাম্পিয়নরা।
তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাস বলছে, আধিপত্য মানেই জয় নয়। গোল না পাওয়া পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য থাকে উন্মুক্ত। আর আর্জেন্টিনার মতো দল, যেখানে মেসির মতো ম্যাচ বদলে দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে এই ম্যাচে মাঠে নেমেই অনন্য কীর্তি গড়েছেন মেসি। ৩৯ বছর বয়সে তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়ক হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম ফুটবলার হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছেন তিনি।
এখন সব অপেক্ষা অতিরিক্ত সময়ের নাটকের। স্পেনের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের ফুটবল নাকি আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা ও মেসির জাদু—কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি, তার উত্তর মিলবে আর কিছুক্ষণ পরই।
সানা/আপ্র/২০/৭/২০২৬