বিশ্বকাপ ফুটবলে বাংলাদেশের জাতীয় দল নেই। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম উন্মাদ সমর্থকগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ রয়েছে এই দেশেই। বিশেষ করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে কোটি মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসা বিশ্ব ফুটবলের অনন্য এক চিত্র হয়ে উঠেছে।
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে উড়তে শুরু করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিশাল পতাকা। রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দেখা যায় প্রিয় দলের প্রতি সমর্থনের নানা আয়োজন। কোথাও লিওনেল মেসির বিশাল প্রতিকৃতি, কোথাও আকাশি-সাদা কিংবা হলুদ-সবুজ জার্সিতে ভক্তদের উন্মাদনা।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর বাংলাদেশে দেখা যায় সেই পরিচিত আবেগের বিস্ফোরণ। ঢাকার কাছের মুন্সিগঞ্জের একটি সুপার মার্কেট চত্বরে হাজারো মানুষ বড় পর্দায় খেলা দেখেন। ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাসের অসংখ্য ভিডিও।
আজ ১৯ জুলাই দিবাগত রাতে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই ম্যাচ ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
ম্যারাডোনা থেকে মেসি, প্রজন্মের পর প্রজন্মের ভালোবাসা: ভৌগোলিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে আর্জেন্টিনার বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও দেশটির ফুটবলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের টান কয়েক দশকের পুরোনো।
এই ভালোবাসার অন্যতম ভিত্তি কিংবদন্তি ফুটবলার দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক দুটি গোল বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই ওই জয়কে প্রতীকী বিজয় হিসেবেও দেখেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ম্যারাডোনার জায়গা দখল করেন লিওনেল মেসি। নতুন প্রজন্মের কাছে মেসিই হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার ভালোবাসার প্রধান প্রতীক। অন্যদিকে ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন নেইমার।
আবেগের সঙ্গে এসেছে অন্ধকার দিকও: বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনা অনেক সময় আনন্দের সীমা ছাড়িয়ে সংঘাতেও রূপ নিয়েছে। বিশ্বকাপ ঘিরে অতীতে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
মেসির পেনাল্টি মিস নিয়ে তর্কের জেরে কুমিল্লায় এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা আলোচনায় আসে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে খেলা দেখতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু, নড়াইলে ফুটবল বিরোধে হত্যাকাণ্ড, চট্টগ্রামে বিজয় উদ্যাপনের সময় দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং বরগুনায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
সম্প্রতি হবিগঞ্জে স্থানীয় ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
সীমান্ত ছাড়িয়ে ফুটবল সংস্কৃতি: বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম শুধু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অন্য দেশগুলোর প্রতিও অনেকের আগ্রহ দেখা যায়।
জার্মানির সমর্থনে বিশাল পতাকা তৈরি করে আলোচনায় এসেছেন এক বাংলাদেশি ভক্ত। এমনকি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা নরওয়েও বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশে ফুটবলের এই উন্মাদনার ইতিহাস দীর্ঘ। ব্রিটিশ আমলে উপমহাদেশে ফুটবলের প্রচলন শুরু হওয়ার পর ষাট ও সত্তরের দশকে ব্রাজিল হয়ে ওঠে অনেকের স্বপ্নের দল। আশির দশকে টেলিভিশনের বিস্তারের সঙ্গে বিশ্বকাপ আরো গভীরভাবে পৌঁছে যায় মানুষের ঘরে ঘরে।
আজকের আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বৈরথ তাই শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, স্মৃতি, প্রজন্মের ভালোবাসা এবং বৈশ্বিক ফুটবল সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ।
তবে এই ভালোবাসা যেন কখনো বিদ্বেষ বা সহিংসতায় পরিণত না হয়-সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট
সানা/আপ্র/১৯/৭/২০২৬