একটি যুগের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ফুটবল বিশ্ব। আর মাত্র একটি ম্যাচ। আর মাত্র একটি রাত। এরপর হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে আর কখনো দেখা যাবে না সেই পরিচিত দৃশ্য—নীল-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির জাদুকরী ছোঁয়া, বল পায়ে তাঁর মায়াবী ছুটে চলা, সতীর্থদের জন্য নিখুঁত পাস কিংবা গোলের পর দুই হাত তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই চিরচেনা উদ্যাপন।
ফুটবলের রাজপুত্রের শেষ বিশ্বকাপ রাতের অপেক্ষায় এখন পুরো বিশ্ব। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চে নিজের শেষ অধ্যায় লিখতে প্রস্তুত আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে রোববার স্পেনের মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আর এই ম্যাচই হতে পারে বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ উপস্থিতি।
৪ বছরের এক স্বপ্ন, প্রায় দুই দশকের এক মহাকাব্যিক যাত্রা এবং কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে মেসি পৌঁছেছেন ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ফাইনালে। যে ট্রফির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে, যে শিরোপা জয়ের পর অপূর্ণতার সব গল্প শেষ হয়েছিল ২০২২ সালে কাতারে—সেই সোনালি ট্রফি নিয়েই শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নামতে যাচ্ছেন তিনি।
শৈশবের ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বজয়ের মঞ্চে
আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মেসির ফুটবলযাত্রা শুরু হয়েছিল খুব ছোটবেলায়। শৈশবেই ধরা পড়ে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা। কিন্তু কঠিন চ্যালেঞ্জও এসেছিল সামনে। শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যার চিকিৎসার খরচ বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। সেই সময় স্পেনের বার্সেলোনা ক্লাব এগিয়ে আসে, আর শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।
বার্সেলোনার যুব একাডেমি থেকে উঠে এসে মেসি হয়ে ওঠেন ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য রেকর্ড, অসংখ্য শিরোপা এবং ব্যক্তিগত অর্জনে তিনি নিজেকে নিয়ে যান অন্য উচ্চতায়।
ক্লাব ফুটবলে গোল, সহায়তা, শিরোপা—সব হিসাবেই তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপ ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।
বিশ্বকাপের আক্ষেপ থেকে পূর্ণতার গল্প
২০০৬ সালে প্রথম বিশ্বকাপে খেলেছিলেন মেসি। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২—পাঁচটি বিশ্বকাপে তিনি দেখেছেন সাফল্য ও হতাশার নানা রূপ।
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠেও জার্মানির কাছে হেরে থেমে যায় আর্জেন্টিনার স্বপ্ন। সেই হারের যন্ত্রণা মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম বেদনাময় অধ্যায় হয়ে ছিল।
কিন্তু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে বদলে যায় সব হিসাব। বয়সের ভার, সমালোচনা আর দীর্ঘ অপেক্ষাকে পেছনে ফেলে মেসি নেতৃত্ব দেন আর্জেন্টিনাকে। ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। আর মেসির হাতে ওঠে সেই অধরা ট্রফি।
সেদিন শুধু একটি শিরোপাই জেতেননি মেসি, তিনি পূর্ণ করেছিলেন কোটি মানুষের বহু বছরের অপেক্ষা।
২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসির জাদু অব্যাহত
বয়স ৩৯-এর কাছাকাছি হলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি দেখিয়েছেন কেন তিনি আলাদা। গতি কিছুটা কমলেও বেড়েছে অভিজ্ঞতা, বেড়েছে খেলার গভীরতা।
এই বিশ্বকাপে তিনি শুধু গোলদাতা নন, বরং আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী। সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়া এবং চাপের সময়ে দলকে সামনে থেকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও দেখা গেছে সেই পুরোনো মেসিকে। ম্যাচের শেষ দিকে তাঁর নিখুঁত ক্রস থেকে লাউতারো মার্তিনেসের গোল আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যায় ফাইনালে। দুটি গোলে সরাসরি অবদান রেখে আবারও প্রমাণ করেছেন—বয়স নয়, মেধা ও মানসিকতাই বড়।
রেকর্ডের পর রেকর্ড
বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসির নাম এখন একাধিক রেকর্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তিনি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের একজন। বিশ্বকাপে দীর্ঘ সময় ধরে দলের নেতৃত্ব দেওয়া, গোল করা এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রে তিনি অনন্য।
আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডের মালিক। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর অর্জনের তালিকা দীর্ঘ—কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, ফাইনালিসিমা—সব বড় ট্রফিই এখন তাঁর ঝুলিতে।
তবে মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো পরিসংখ্যানে নয়; বরং তিনি ফুটবলকে যেভাবে ভালোবাসার ভাষায় পরিণত করেছেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
শেষ রাতের আগে শেষ অপেক্ষা
মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায় এখন এসে দাঁড়িয়েছে একেবারে শেষ পাতায়। সামনে স্পেন। সামনে আরেকটি ইতিহাসের হাতছানি।
আর্জেন্টিনা জিতলে মেসি বিদায় নেবেন বিশ্বকাপের মুকুট মাথায় রেখে। হারলেও তিনি থেকে যাবেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবে।
কারণ মেসির গল্প শুধু ট্রফির গল্প নয়। এটি সংগ্রামের গল্প, অপেক্ষার গল্প, অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। এটি সেই এক ছোট্ট ছেলের গল্প, যে বল পায়ে পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছে।
রোববারের রাত তাই শুধু একটি ফাইনাল নয়। এটি হতে পারে ফুটবলের এক রাজপুত্রের শেষ বিশ্বকাপ রাত।
যে রাতে কোটি চোখ থাকবে একজন মানুষের দিকে—লিওনেল মেসি। হয়তো শেষবারের মতো।
সানা/আপ্র/১৬/৭/২০২৬