গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

প্রবৃদ্ধির খাতায় যারা নেই

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:২৬ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:১৬ এএম ২০২৬
প্রবৃদ্ধির খাতায় যারা নেই
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে

বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বশেষ চিত্র সম্প্রতি প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। ছবিটি খুব স্বস্তির নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা প্রতিদিন ৩ ডলার ধরে দরিদ্র মানুষের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে এই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। জাতীয় দারিদ্র্যসীমাতেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ২০২২ সালে যে হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে।

২১ লাখ মানুষ মানে শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে আছে লাখ লাখ পরিবারের জীবনযুদ্ধ। এদের অনেকেই হয়তো দীর্ঘদিন দরিদ্র ছিলেন না। তারা সামান্য আয়ের চাকরি করতেন, ছোট ব্যবসা করতেন কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতেন। কিন্তু যখন কাজের সুযোগ কমে যায়, আয় কমে যায় এবং একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে, তখন সামান্য আয়ের পরিবারও দ্রুত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এখানেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের জীবনের পার্থক্যটি বোঝা যায়।

একটি দেশের মোট উৎপাদন বাড়তে পারে। কিন্তু ওই প্রবৃদ্ধি যদি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না করে, মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ায়; তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে তার সুফল খুব কমই পৌঁছায়। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে। দুর্বল বিনিয়োগ, কম কর্মসংস্থান, জ্বালানি সংকট এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা এই ধীরগতির বড় কারণ।

মূল্যস্ফীতিও মানুষের ওপর চাপ বৃদ্ধি করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে- যা আগের বছরের প্রায় ১০ শতাংশের তুলনায় কম। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; এর অর্থ হলো দাম বৃদ্ধি গতি কিছুটা কমেছে। তাই যাদের আয় একই জায়গায় আছে- তাদের জন্য চাল, ডাল, সবজি, পরিবহন ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ এখনো বড় চাপ। বিশ্বব্যাংকও বলছে, নিম্ন আয়ের মানুষের মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ দুর্বল হয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহের সমস্যায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। রফতানিও দুর্বল হয়েছে। এসবের প্রভাব শেষ পর্যন্ত শ্রমবাজারে পড়ে। কাজের সুযোগ কমলে প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হন কম দক্ষ ও কম আয়ের শ্রমিকেরা। নারীদের কর্মসংস্থানও এই পরিস্থিতিতে বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

ব্যাংক খাতের অবস্থা আরও চিন্তার। জুন ২০২৬-এ খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ- যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ব্যাংকঋণ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ অত্যন্ত দুর্বল। ফলে নতুন বিনিয়োগ, নতুন ব্যবসা এবং নতুন কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজস্ব পরিস্থিতিও ভালো নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল। এত কম রাজস্ব নিয়ে সরকারকে একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য জরুরি খাতে ব্যয় করতে হয়। ফলে দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে। তবে সব খবর খারাপ নয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমেছে এবং অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। কিন্তু রেমিট্যান্স দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের বিকল্প নয়। বরং দেশে ভালো কাজের সুযোগ কম থাকলে বিদেশমুখী শ্রম অভিবাসনের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দরিদ্রতম পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। অর্থাৎ সরকার বিভিন্ন ভাতা, খাদ্য সহায়তা ও ভর্তুকিতে অর্থ ব্যয় করলেও যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের একটি বড় অংশ সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, খাদ্যভিত্তিক ভর্তুকির সমন্বয় এবং নগদ সহায়তার লক্ষ্য নির্ধারণ আরো ভালোভাবে করা গেলে অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব। এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে।

শুধু ভাতা দিয়ে দারিদ্র্য স্থায়ীভাবে কমানো যায় না। মানুষের জন্য স্থায়ী ও সম্মানজনক আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, তরুণ ও নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা ও আয়ের সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। ব্যাংক খাত সংস্কার, জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া- সব কাজ একসঙ্গে করতে হবে।

অর্থনীতির আসল প্রশ্ন তাই শুধু প্রবৃদ্ধি কত হলো, তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল কারা পেলেন, আর কারা পেছনে পড়ে গেলেন। ২১ লাখ নতুন দরিদ্র মানুষ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে অর্থনীতির সাফল্য কেবল জিডিপির হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। মানুষের আয়, কাজ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাই শেষ পর্যন্ত বলে দেয় একটি অর্থনীতি কতা সফল। প্রবৃদ্ধির খাতায় যাদের নাম নেই, অর্থনীতির খাতায় তাদেরই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

শরীর ডুবিয়ে রেখে নাক ভাসিয়ে বেঁচে আছেন সাধারণ মানুষ
১৫ অক্টোবর ২০২৬

শরীর ডুবিয়ে রেখে নাক ভাসিয়ে বেঁচে আছেন সাধারণ মানুষ

শাহানা হুদা রঞ্জনাবাজারে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে দুই বেলা পেট ভরে খা...

হুথি-সৌদি আরব সংঘাত: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা
১৪ অক্টোবর ২০২৬

হুথি-সৌদি আরব সংঘাত: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা

ড. ফরিদুল আলমবাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাকশিল্প। এর বাইরেও চামড়া ও চামড়া...

শুদ্ধতার সূচনা করতে হবে নিজের ঘর থেকেই
১৪ অক্টোবর ২০২৬

শুদ্ধতার সূচনা করতে হবে নিজের ঘর থেকেই

আবু হেনা রাজ্জাকীএকটি সমাজে অপরাধের বিস্তার কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অনিয়ম,...

জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করবে তৃণমূলের জনসংগঠন
১৪ অক্টোবর ২০২৬

জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করবে তৃণমূলের জনসংগঠন

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ====একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি কী? এর উত্তর কেবল মাথাপিছু আয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পরিচয় যা-ই হোক, চাঁদাবাজ-দখলদারদের ছাড় নয়: ডিএমপি কমিশনার

চাঁদাবাজ, ভূমি দখলবাজ ও মাদক কারবারে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। এসব অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ডিএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে এসব নির্দেশনা দেন কমিশনার। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- কমিশনার যে নির্দেশনা দিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা তা বাস্তবে তা করতে পারবেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে