রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি পাচ্ছেন না চালকেরা। কোথাও কোথাও দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে কমেছে চালকদের আয়, বেড়েছে যাত্রীদের ভোগান্তি। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতেও তীব্র গ্যাস সংকটে রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার ব্যবহার করছে বৈদ্যুতিক চুলা।
রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক এলাকায় খোঁজ নিয়ে গ্যাস সংকটের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
হাতিরঝিল-বাড্ডা সংলগ্ন জামান সিএনজি স্টেশনে গত কয়েক দিনের মতো শনিবারও গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় বন্ধ। মাঝে মধ্যে সামান্য গ্যাস এলে অপেক্ষমাণ কয়েকটি গাড়িতে সরবরাহ করা হচ্ছে। এরপর আবার শুরু হচ্ছে অপেক্ষার পালা। কখন গ্যাস আসবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ।
মূল সড়কের পাশে হওয়ায় স্টেশনের সামনে গাড়ি রাখার সুযোগ নেই। ট্রাফিক পুলিশের বাধার কারণে চালকদের হাতিরঝিলের ভেতরে কিংবা আশপাশের গলিতে গাড়ি রাখতে হচ্ছে। গ্যাস না থাকায় অনেকেই অন্য স্টেশনে যাওয়ার অবস্থায়ও নেই। বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।
সিএনজি অটোরিকশাচালক কাওসার বলেন, ‘‘শনিবার ভোর থেকে অপেক্ষা করছি। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়ার কোনো খবর নেই। কখন আসবে, সেটিও কেউ বলতে পারছে না। গাড়িতে গ্যাস নেই, তাই অন্য কোথাও যেতেও পারছি না।’’
মধ্য বাড্ডার মা সিএনজি স্টেশনেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে চালকেরা গ্যাসের অপেক্ষা করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর প্রায় সব সিএনজি স্টেশনেই একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কোথাও গ্যাস এলে এক থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কমেছে চালকদের আয়, বেড়েছে যাত্রী ভাড়া: সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকেরা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের দৈনন্দিন আয় কমে গেছে। পর্যাপ্ত ট্রিপ দিতে না পারায় পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দ্রুত সংকট সমাধানের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গ্যাসের অভাবে রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় বেড়েছে ভাড়াও।
বনশ্রী থেকে পান্থপথগামী এক যাত্রী জানান, আগে এই পথে সিএনজিতে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা ভাড়া লাগলেও এখন দিতে হচ্ছে ৩০০ টাকা। অনেক সময় চালকেরা ৩৫০ টাকা পর্যন্ত দাবি করছেন।
চালকদের ভাষ্য, গ্যাস নিতে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার অনেক সময় গ্যাসের চাপ কম থাকায় পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যায় না। ফলে এক-দুইটি ট্রিপ দেওয়ার পরই আবার গ্যাস শেষ হয়ে যায়।
বাসাবাড়িতেও গ্যাসের জন্য হাহাকার: শুধু সিএনজি স্টেশন নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতেও তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাসের অভাবে রান্না করতে না পেরে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছে। কেউ কেউ গ্যাসের চাপ বাড়ানোর যন্ত্রও কিনছেন।
বনশ্রীর বাসিন্দা কানিজ ফাতিমা বলেন, ‘‘দিন-রাত কোনো সময়ই ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ গ্যাস আসে, তা দিয়ে কিছু গরম করাও সম্ভব হয় না।’’
তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন। তবে এতে সব ধরনের রান্না করা সম্ভব হয় না।
একই এলাকার বাসিন্দা আফরোজা বেগম বলেন, ‘‘গ্যাসের ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে। রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। সকালের নাস্তা বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে। দুপুরের রান্না করতে হচ্ছে বৈদ্যুতিক চুলায়।’’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক চুলা ও গ্যাসের চাপ বাড়ানোর যন্ত্রের চাহিদা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এক ব্যবসায়ী সোহেল বলেন, নিয়মিত গ্যাস না পাওয়ার কারণে ক্রেতারা বাধ্য হয়ে এসব পণ্য কিনছেন।
এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটিতে সরবরাহ ব্যাহত: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেই গ্যাস সংকট চলছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, এলএনজির ভাসমান টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
তিনি বলেন, ত্রুটি মেরামতের কাজ চলছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোর সংকট সাময়িক।
তিনি জানান, একটি এলএনজির ভাসমান টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতে।
মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশে গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সানা/আপ্র/২৫/৭/২০২৬