খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংস অস্বাভাবিকভাবে সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়লেও, পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ ছাড়া এ ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন। তার মতে, বিষয়টি নিয়ে যেমন অযথা আতঙ্কিত হওয়া ঠিক নয়, তেমনি গুরুত্বহীন মনে করাও উচিত নয়।
গত ২২ জুলাই খুলনার পাইকগাছা পৌরসভার একটি বেকারির কর্মীরা বনভোজনের জন্য কেনা গরুর মাংস রান্না করার সময় সেটির রং অস্বাভাবিকভাবে সবুজ হয়ে যেতে দেখেন। পরে তারা হাঁড়িসহ মাংসটি স্থানীয় থানায় নিয়ে যান। ঘটনার পর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।
শনিবার (২৫ জুলাই) এক সাক্ষাৎকারে ড. মিনারা খাতুন বলেন, শুধু মাংস একদিনের পুরোনো ছিল—এ তথ্য দিয়ে সবুজ হয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। তবে মাংসে অস্বাভাবিক সবুজ রং, দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সেটি খাওয়া থেকে বিরত থেকে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করা উচিত।
তিনি জানান, জবাইয়ের পর ০ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে একদিনের মধ্যে মাংস সাধারণত সবুজ হয়ে যায় না। এ সময় মাংস কিছুটা গাঢ় বা বাদামি রং ধারণ করতে পারে, তবে স্পষ্ট সবুজ রং স্বাভাবিক নয়।
মাংসের ঝোল লাল থাকলেই সেটি নিরাপদ—এ ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, ঝোলের রং মূলত রক্তের রঞ্জক, মসলা এবং রান্নার সময়ের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। তাই ঝোলের রং দেখে মাংসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
একই গরুর অন্য অংশ কিনে নেওয়া ক্রেতাদের কোনো সমস্যা হয়নি—এমন দাবি কিংবা বেকারিতে ব্যবহৃত কোনো রাসায়নিকের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে—এ ধরনের ধারণারও নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলে জানান তিনি। একই পশুর বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণ পদ্ধতি, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা দূষণের ভিন্নতার কারণে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে পারে।
ড. মিনারা খাতুন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের ঘটনার নজির রয়েছে। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মাংসের লাল রঞ্জক মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন, অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার কারণে সালফমায়োগ্লোবিন সৃষ্টি, তামা বা অন্যান্য ধাতব যৌগের সংস্পর্শ কিংবা সিউডোমোনাস প্রজাতির রঞ্জক উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে পেশির আঁশে আলোর প্রতিফলনের কারণেও সবুজ, নীল বা রংধনুর মতো আভা দেখা যেতে পারে, যা সবসময় মাংস নষ্ট হওয়ার লক্ষণ নয়।
তিনি আরো বলেন, জবাই থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড চেইন বজায় রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানি এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মাংসের উৎস, জবাইয়ের সময় ও সংরক্ষণসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এসি/আপ্র/২৫/০৭/২০২৬