দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক তথ্য অনুসন্ধানে তরুণদের আগ্রহের শীর্ষে রয়েছে সরকারি চাকরি। এর পরেই স্থান পেয়েছে ক্রীড়া বিষয়ক তথ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে এমন চিত্র, যেখানে তরুণ প্রজন্মের অনলাইন আগ্রহ, ডিজিটাল দক্ষতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রকাশ পেয়েছে।
‘তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে ব্যবহার ২০২৪-২৫’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ সরকারি চাকরি সম্পর্কিত তথ্য সবচেয়ে বেশি খোঁজেন। ক্রীড়া বিষয়ক তথ্য খোঁজেন ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এছাড়া পাসপোর্ট সেবা, বিভিন্ন সরকারি সেবা এবং অনলাইন কেনাকাটার বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে তাদের।
জরিপ অনুযায়ী, গত তিন মাসে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ অনলাইনে পণ্য বা সেবা কিনেছেন। আর গত এক বছরে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ অনলাইনের মাধ্যমে সরকারি সেবা গ্রহণ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এতে তথ্য উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক সৈয়দা মারুফা শাকি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার।
জরিপে দেশের মানুষের ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশের দক্ষতা কেবল কপি-পেস্ট কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ডিভাইস বা অ্যাপ থেকে ফাইল স্থানান্তরের মতো মৌলিক কাজ করতে পারেন মাত্র ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ।
অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়েও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৫০ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো ধরনের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ পাননি এবং তারা ডিজিটাল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে ভাইরাস বা ক্ষতিকর সফটওয়্যারের সংক্রমণকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। তবে শহর ও গ্রামের মধ্যে রয়েছে বড় বৈষম্য। শহরে এই হার ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও গ্রামে তা মাত্র ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। যদিও প্রতিদিন অন্তত একবার ইন্টারনেট ব্যবহার করেন ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ।
জেলাভিত্তিক হিসাবে ইন্টারনেট ব্যবহারে শীর্ষে ঢাকা, যেখানে ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বিপরীতে ময়মনসিংহে এই হার সর্বনিম্ন, ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই জরিপে মোট ২ লাখ ৬৪ হাজার পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যেখানে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সী নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ব্যক্তি পর্যায়ে ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। ইন্টারনেট ব্যবহার করেন ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কম্পিউটার ব্যবহার করেন মাত্র ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। মোবাইল ব্যবহারে নারীরা এখনও পিছিয়ে; পুরুষের হার ৭০ শতাংশ, নারীদের ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
পরিবার পর্যায়ে ৯৮ শতাংশের বেশি ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে এবং ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে। প্রায় সব পরিবারেই কোনো না কোনো ধরনের মোবাইল ফোন রয়েছে।
স্মার্টফোন ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ফেনী জেলা, আর মোবাইল ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও পঞ্চগড়।
অন্যদিকে, দেশে ৫৫ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ঢাকায় ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৬৬ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৬৫ শতাংশ।
গৃহস্থালী যন্ত্রপাতির ব্যবহারে দেখা গেছে, ৯ শতাংশ পরিবারে কম্পিউটার রয়েছে। টেলিভিশন রয়েছে ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারে, তবে এর ব্যবহার কিছুটা কমেছে। বিপরীতে রেডিওর ব্যবহার বেড়ে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মোবাইলসহ বিভিন্ন ডিভাইসে রেডিও সুবিধা যুক্ত হওয়ায় সহজলভ্য হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে জরিপটি দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির পাশাপাশি দক্ষতা, নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার বৈষম্যের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে।
সানা/আপ্র/১৭/৪/২০২৬