সাভারের ভয়াবহ রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বহুল আলোচিত দুটি মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। তবে দীর্ঘ স্থবিরতার পর হত্যা মামলার কার্যক্রমে কিছুটা গতি এলেও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি সাক্ষীর অভাবে কার্যত থমকে আছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হত্যা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা গেলে চলতি বছরের মধ্যেই রায় পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ইমারত আইনের মামলায় অভিযোগ গঠনের পরও এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি, কারণ নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীরা আদালতে হাজির হচ্ছেন না।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ১০ তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শিল্প দুর্ঘটনা ঘটে। ভবনের ভেতরে থাকা কয়েকটি পোশাক কারখানার প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েন। কয়েকদিনের উদ্ধার অভিযানে ১ হাজার ১৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়, যাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর আহত ও পঙ্গু হন।
ঘটনার পাঁচদিন পর ২৯ এপ্রিল ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভবনটির মালিক সোহেল রানাকে যশোরের বেনাপোল থেকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলার মধ্যে হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাকেই প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১ জুন সিআইডি দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে একটি মামলায় সোহেল রানা, তার বাবা-মা, তৎকালীন সাভার পৌরসভার মেয়র ও কমিশনারসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়। অপরদিকে ইমারত বিধি না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে আরেক মামলায় ১৮ জনকে আসামি করা হয়।
হত্যা মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘদিন এই মামলার কার্যক্রম বন্ধ ছিল। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এবং দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে শুনানি চলছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এখন পর্যন্ত যেসব সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে অধিকাংশই ভুক্তভোগীর স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। রানা প্লাজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও চিকিৎসকদের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করা গেলে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছালেও কার্যত অগ্রগতি নেই। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর মামলাটি পুনরায় সচল হলেও নির্ধারিত তারিখে কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হচ্ছেন না। সর্বশেষ ২০ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণের দিন থাকলেও কেউ উপস্থিত না হওয়ায় শুনানি হয়নি। পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর।
এ মামলায়ও ভবন মালিক সোহেল রানাসহ একাধিক ব্যক্তি আসামি। বর্তমানে তিনি কারাগারে থাকলেও অধিকাংশ আসামি জামিনে অথবা পলাতক রয়েছেন। কয়েকজন আসামি ইতোমধ্যে মারা গেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, তারা সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকলেও সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা আসামিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হত্যা মামলায় কিছুটা গতি এলেও ইমারত আইনের মামলার এই স্থবিরতা রানা প্লাজা ট্রাজেডির বিচারপ্রক্রিয়াকে এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রেখে দিয়েছে।
সানা/আপ্র/২৪/৪/২০২৬